অনলাইন জুয়া প্রসঙ্গে
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ জুন ২০২৬, ১২:২২:৫৮ অপরাহ্ন
সম্প্রতি মিডিয়ায় ‘সিলেটে যে খেলায় সর্বস্ব হারাচ্ছেন তারা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সিলেটে দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে অনলাইন ও অফলাইন জুয়ার বিস্তার। মহানগরী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত কোথাও বাদ পড়েনি এই আসক্তিতে। মহানগরীর বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকান, রাস্তার মোড়, গলিপথ ও আড্ডাস্থলে প্রকাশ্যে ও গোপনে চলছে এই ভাসমান জুয়ার আসর। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত দেদারসে চলছে এই ভাসমান জুয়ার আসর। মোবাইল ফোনভিত্তিক বিভিন্ন জুয়ার অ্যাপস সহজলভ্য হওয়ায় কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ, মধ্যবয়সী, এমনকি বৃদ্ধদের মধ্যেও বাড়ছে জুয়ার আসক্তি।
বলা বাহুল্য, অল্প সময়ে বেশী লাভের আশায় প্রতিদিনই বাড়ছে জুয়াড়ির সংখ্যা। অনেকেই প্রথমে কৌতুহলবশতঃ শুরু করলেও পরবর্তীতে সেই খেলা মারাত্মক নেশায় রূপ নিচ্ছে তাদের কাছে। এর ফলে একদিকে যেমন ব্যক্তি ও পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জুয়ার আসক্তির সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি ও ডাকাতির মতো অপরাধ। এভাবে সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধ প্রবণতা দিন দিন আরো জটিল আকার ধারণ করছে। আর এসব অপরাধের সঙ্গে জুয়ার অর্থ জোগানের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ, জুয়ার নেশা পূরণ করতে গিয়ে অনেকেই উচ্চ সুদে টাকা ধার করছেন। আবার কেউ কেউ সর্বস্ব হারিয়ে অপরাধের পথে পা বাড়াচ্ছেন। সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অসাধু সুদের কারবারিরা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ঋণগ্রহীতাদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার অ্যাপস ইনস্টল করে দিচ্ছে। পরে জুয়ার মাধ্যমে দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আরো বেশী অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে। এতে সহজেই নতুন জুয়া খেলোয়াড় সৃষ্টি হচ্ছে এবং জুয়ার জাল আরো বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে অনেক পরিবার ঋণ ও জুয়ার দ্বৈত ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, স্মার্ট ফোন ও ইন্টারনেট এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই নীরবে বিস্তার লাভ করছে একটি ভয়ংকর প্রবণতা, যার নাম অনলাইন জুয়া। এ সময় জুয়া খেলা ছিলো নির্দিষ্ট কিছু স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এখন তা চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। ফলে খুব সহজেই যে কেউ এই ফাঁদে পা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়া শুধু ভাগ্যের খেলা নয়, এটি মানুষের মস্তিস্ককে লক্ষ্য করে ডিজাইন করা হয়েছে। প্রতিটি জেতা বা হারার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিস্কে ডোপামিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা উত্তেজনা তৈরী করে। এই উত্তেজনা ধীরে ধীরে অভ্যাস বা আসক্তিতে পরিণত হয়। ব্যবহারকারীরা বুঝতে পারে না, কখন সে এই অভ্যাসের দাস হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে জুয়া আইনতঃ নিষিদ্ধ হলেও অনলাইন প্লাটফর্মগুলো বিদেশ থেকে পরিচালিত হওয়ায় এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ভিপিএন, এনক্রিপশন ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ব্যবহারের কারণে এই কার্যক্রম শনাক্ত করা জটিল হয়ে যায়। ফলে আইন প্রয়োগে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরী হচ্ছে। এই নীরব মহামারি মোকাবেলায় এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সচেতনতার পাশাপাশি প্রযুক্তি নির্ভর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিরোধ ইউনিটকে আধুনিক প্রযুক্তি ডেটাঅ্যানালিটিকস্ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। যেসব ওয়েবসাইট, অ্যাপ ও প্রতিষ্ঠান এসব কার্যক্রমের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু ব্লক করাই যথেষ্ট হবে না, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এটি অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। কোন পাবলিক ফিগার যদি অনলাইন জুয়ার প্রচারণায় যুক্ত হন, তবে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
গণমাধ্যম, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো জরুরী। বাস্তব ঘটনা, ক্ষতির চিত্র এবং ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলে মানুষ আরো দ্রুত সচেতন হবে। ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সন্দেহজনক লেনদেন সহজে শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ব্যাংক ও মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসগুলোকে এক্ষেত্রে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ক্ষতিকর ওয়েবসাইট ব্লক ফিল্টারিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারী সহজে এসব প্লাটফর্মে প্রবেশ করতে না পারে।
লক্ষণীয় যে, ইসলামে জুয়াকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা হয়েছে এবং এটাকে শয়তানের কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে এই হারাম কাজের বিস্তার রোধে ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে তৎপর হতে হবে, এমন অভিমত সচেতন মহলের।




