তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হতাহতের ঘটনা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৭:৩৯ অপরাহ্ন
সোমবার দৈনিক জালালাবাদে ‘হবিগঞ্জে ৮ মাসে শতাধিক সংঘর্ষঃ নিহত ১৯’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, তুচ্ছ ঘটনা, আধিপত্য বিস্তার, সামাজিক বিরোধ কিংবা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ইত্যাকার বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সংঘাত যেনো নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায়। এসব ঘটনায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াসহ অনেক সময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর হবিগঞ্জ জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে প্রায় শ’খানেক। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন, আহত সহস্রাধিক। শুধুই কি হবিগঞ্জ গত মঙ্গলবার সিলেটের জৈন্তাপুরে আরেকটি ঘটে। দোকানে ২০ টাকার জর্দা বাকী চেয়েছিলো এক তরুণ। দোকানী দিতে রাজী হয়নি। কথা কাটাকাটি, এরপর দু’পক্ষের লোকজন এসে সংঘর্ষ। লাঠির আঘাতে মারা গেলেন একজন, যিনি ঝগড়ার সঙ্গে ছিলেন না, এসেছিলেন ছাড়াতে। একটি জীবনের দাম ২০ টাকা হয়ে গেলো। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এখন বাংলাদেশের প্রতিদিনের চিত্র।
গত এক মাসের পত্রিকার পাতা উল্টালে কী দেখা যায়? দেখা যায়, গাইবান্ধায় হাঁসের ধান খাওয়া নিয়ে দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্বে খুন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিএনজির সীটে বসা নিয়ে ছুরিকাঘাতে তরুণ নিহত। নরসিংদীতে ক্রিকেট খেলায় নো-বল নিয়ে বিতর্কে কলেজ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা। ফরিদপুরে আম গাছের ছায়া নিয়ে প্রতিবেশীর হাতে প্রতিবেশী খুন। কিশোরগঞ্জে ফেইসবুকে হা-হা রিয়েক্ট দেওয়া নিয়ে সংঘর্ষে ১০ জন আহত। দেখা গেছে, বেশ কিছু এলাকা সংঘাত ও সংঘর্ষ প্রবণ। এর মধ্যে রয়েছে সিলেট অঞ্চলের ছাতক, হবিগঞ্জ, কানাইঘাটসহ অন্যান্য বেশ কিছু এলাকা ও অঞ্চল।
অনেকের মতে, দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সংঘাত সংঘর্ষ প্রবণ এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এখানে হাঁকডাক করে আহবান জানিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে গ্রামে গ্রামে মারামারি করতে দেখা যায়। আর সিলেটের ছাতকে বিগত বছরগুলোতে অগনিত মারামারির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সংঘটিত হত্যাকান্ডের ৪২ শতাংশই ঘটে পূর্ব শত্রুতা নয়, বরং তাৎক্ষণিক তুচ্ছ তর্ক বিতর্ক কথা কাটাকাটি থেকে। এই পরিসংখ্যানটি ভয়াবহ। এর অর্থ, আমরা খুনি হয়ে জন্মাচ্ছি না, পরিস্থিতি আমাদের খুনি বানাচ্ছে। পাঁচ মিনিটের রাগ, যা পাঁচ ঘণ্টা পরেই মিলিয়ে যেতো, তা কেড়ে নিচ্ছে সারা জীবনের জন্য সবকিছু। প্রশ্ন জাগে, আমরা কবে এবং কেনো এতো অসহিষ্ণু হলাম? বিজ্ঞজনেরা বলেন, একটা কাজ করার আগে ভাবো, সময় নাও। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এখন আর কেউ সময় নেয় না। এক সময় ঝগড়া হলে মুরব্বিরা এসে বলতেন, ‘থামো’। সেই থামার সংস্কৃতি উঠে গেছে। এখন যেনো প্রত্যেকেই নেতা, প্রত্যেকেরই দল আছে, হাতিয়ার অস্ত্র আছে। সালিশের জায়গা দখল করেছে ‘শো-ডাউন’ অর্থাৎ শক্তি প্রদর্শন। এর পেছনে ৩ টি গভীর ক্ষত কাজ করছে। প্রথম ক্ষতটি হলো, বিচারহীনতার বোধ। যখন মানুষ প্রতিদিন দেখে প্রভাবশালীরা বড় অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, তাদের কিছুই হচ্ছে না, তখন সাধারণ মানুষের মনে আইনের ভয় ওঠে যায়। এই ‘পার পেয়ে যাবা’র মনোভাবই সবচেয়ে বিপজ্জনক। দ্বিতীয় ক্ষতটি হচ্ছে, চাপা অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ। যখন একজন মানুষ সারাদিন কাজ খুঁজে পায় না, ঘরে খাবার নেই, ঋণের তাগাদা, সন্তানের স্কুলের বেতন বাকি, অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপ থাকে, তখন তার দেহমনে আগুন জ¦লতে থাকে। সেই আগুনে ঘি পড়ে তুচ্ছ কথায়, সামান্য ঘটনায়। ব্যর্থতা ও হতাশা থেকে উৎপত্তি হয় বড় বিরোধ বা সংঘাত-সংঘর্ষের। তৃতীয় ক্ষতটি হলো, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও প্রযুক্তির অপব্যবহার। ফেইসবুক, টিকটকসহ নানা প্রযুক্তিও মানুষকে বিরক্ত ও অধৈর্য করছে অনেক ক্ষেত্রে। একটা কমেন্ট, একটা গালি কিংবা একটি ভিডিও-মুহূর্তে ভাইরাল, মূহূর্তে দলবল নিয়ে হামলা। সঙ্গে আছে চাঁদাবাজিসহ অন্যায়ভাবে অর্থ আদায় ও আত্মসাতের বিষয়টিও।
গুণীজনদের মতে, একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার বড় বড় দালানকোঠা দিয়ে নয়, সে তার ছোট বিরোধ কীভাবে মেটায়, শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করে, তা দিয়ে। লন্ডন, টোকিও, মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরে ঝগড়া যে হয় না এমন নয়, কিন্তু ২০ টাকার জন্য তর্কাতর্কি থেকে কেউ হাতিয়ার লাঠি হাতে নেয় না। কারণ সেখানে মানুষ জানে, কঠোর আইন আছে এবং আইন দ্রুত কাজ করে। এর সমাধান একটিতে নয়, সমন্বিত উদ্যোগে। পুলিশি তৎপরতা এর একমাত্র সমাধান নয়। প্রতিটি পৌরসভা ও ওয়ার্ড ইউনিয়নে বিকল্প আদালত বা বিচার ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হবে। ছোট বিরোধ যাতে থানায় যাওয়ার আগেই মীমাংসা হয়, সেই উদ্যোগ নিতে হবে। স্কুলের পাঠ্যক্রমে সহনশীলতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ ও সংলাপের শিক্ষামূলক চাপ্টার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত বিচার। তুচ্ছ ঘটনায় খুনের বিচার যদি ৬ মাসের মধ্যে হয় এবং তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, তবে পরের বার লাঠি, হাতিয়ার ও অস্ত্র হাতে তোলার আগে হাত কাঁপবে, দশবার ভাববে। এসব অনুশীলনই পারে একটি সমাজকে কথায় কথায় মারামারি, হানাহানি ও খুনোখুনি থেকে রক্ষা করতে।





