ঘুষ নিয়ে তোলপাড়
প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১১:৪৯ অপরাহ্ন
ঘুষের অভিযোগ জানাতে তৈরী ওয়েবসাইট ‘ঘুষডটসাইট’ নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। কিশোর শাহেদ শরীফ এই ওয়েবসাইটের নির্মাতা। শাহেদের ঘুষ ডট সাইটে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ প্রায় ৩৬০ কোটি টাকা। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আগ্রহ প্রকাশ করে খোঁজ খবর নিয়েছে বলে জানা গেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর নিজ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে শাহেদের সঙ্গে কথা বলেন ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক। সেখানে শাহেদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তার কোন সহযোগিতা প্রয়োজন আছে কি-না, সে বিষয়ে আলোচনা হয়।
উল্লেখ্য, প্রয়াত শিক্ষিকা মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে গেলে শাহেদের কাছে বড় অংকের ঘুষ দাবি করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কিশোর শাহেদ গত ২১ আগস্ট ঘুষ ডট সাইট নামের একটি ওয়েব সাইট তৈরী করে। সেখানে ঘুষের অভিযোগ জানাতে শুরু করেন অসংখ্য মানুষ। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস শাহেদের পিতাকে ডেকে পেনশনের কাগজপত্র দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়। কর্তৃপক্ষ অনিয়মে জড়িত দুই কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করে। শাহেদ শরীফের সঙ্গে বৈঠক শেষে ময়মনসিংহ সিটি প্রশাসক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকেন এমন একজন গত সোমবার রাতে উক্ত সাইট নিয়ে প্রকাশিত একটি মিডিয়া রিপোর্ট তাকে পাঠান। তিনি সাইটটি নিয়ে শাহেদের বক্তব্য ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাবেন। বিষয়টি পাঠানোর পর হয়তো প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। সরকারের গবেষণা বা সংশ্লিষ্ট ফোন প্রতিষ্ঠানকেও এ কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। প্রশাসক বলেন, মূলত: ঘুষ ডট সাইটের ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং সরকার কীভাবে এ উদ্যোগে সহযোগিতা করতে পারে তা নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের সাথে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাইট নির্মাতা কিশোর শাহেদের বক্তব্য হলো, আমি এখনো শিক্ষার্থী। ঘুষ ডট সাইট ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কাজের চাপ কমানোর জন্য যদি কোন ধরনের সরকারী সহায়তা বা সরকারী পর্যায়ের স্বীকৃতি পাওয়া যায়, তাহলে আমার পক্ষে কাজটি এগিয়ে নেয়া সহজ হবে। শাহেদ আরো বলেন, আমার মনে হচ্ছে, সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। জানা গেছে, ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বলেন, সারা বাংলাদেশে জেনারেশন জেডের অনেক ছেলে মেয়ে আছে, যারা দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে চায়। সম্প্রতি ‘ঘুষ উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা’ শীর্ষক একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে মিডিয়ায়।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন ঘুষ আর কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা পরিণত হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক রেওয়াজ বা সংস্কৃতিতে। প্রায় প্রতিটি সেবায় মানুষকে হয় সরাসরি টাকা দিতে হচ্ছে, নয়তো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরীব মানুষ। এছাড়া ঘুষের কারণে বিনিয়োগ হচ্ছে না দেশে। একজন উদ্যোক্তাকে যখন ফ্যাক্টরীর লাইসেন্স নিতে ১০টি টেবিলে টাকা দিতে হয় তখন তার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ে সেবা বা পণ্যের এবং এটা গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতার ওপর। বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এই হয়রানির কারণে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ঘুষ দুর্নীতির চক্র তৈরী করে। আজ যে তরুণ কর্মকর্তা ঘুষ নিচ্ছে, কাল সে বড় পদে গিয়ে আরো বড় ঘুষের নেটওয়ার্ক তৈরী করবে। এতে সৎ ও মেধাবীরা হতাশ হচ্ছে, তারা কোনঠাসা হয়ে পড়ছে।
সচেতন মহল মনে করেন, মানুষকে অফিসে যেতে হবে কেন? প্রায় সব কাজ অনলাইনে সম্ভব। এতে ঘুষের সুযোগ ৮০ শতাংশ কমে যাবে। শুধু বদলীর মত হালকা শাস্তি নয়, ঘুষের প্রমাণ পেলে চাকুরীচ্যুতি ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত নিশ্চিত করা উচিত। চীনে বড় ধরনের ঘুষ গ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড গ্রহণের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদন্ড প্রদানেরও বিধান রয়েছে। ফলে চীনে দুর্নীতি হ্রাস পেয়েছে অভাবনীয় হারে। অনেক নিম্নপদস্থ কর্মচারী বেতন কম হওয়ায় ঘুষে জড়ায়। তাদের জীবন মানের নিশ্চয়তা দিতে হবে, পাশাপাশি সততার জন্য ভালো পুরস্কার দিতে হবে। টিআইবি’র এক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৯.৩ শতাংশ মানুষ সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের শিকার হন। সেবাগ্রহীতাদের প্রায় ৮১.৫ শতাংশ মনে করেন, ঘুষ না দিলে কোন কাজই হয় না। এ এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। কিশোর শাহেদের ঘুষ ডটসাইটটি রাষ্ট্রের এই অন্ধকার দিকে ফোকাস করার পাশাপাশি একটি প্রতিবাদের ঢেউ সৃষ্টি করেছে। এখন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে ঘুষ নামক এই জঘন্য অপকর্ম ও অপরাধের টুঁটি টিপে ধরতে। প্রশ্ন হচ্ছে, এদেশে কি তা আদৌ সম্ভব?




