ডাকসু: সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের মঞ্চ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৭:০৯ অপরাহ্ন
সম্প্রতি মিডিয়ায় ‘বিশ^বিদ্যালয় দিল ৩৫ লাখ, ডাকসু করলো ৩৫ কোটি টাকার কাজ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন এই ডাকসুর মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর। বছর পেরোতেই ডাকসুর কাজের মূল্যায়ন করছেন অনেকেই।
ডাকসু নেতাদের দাবি সীমিত সুযোগেও শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তারা। বলেছেন, বিশ^বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে মাত্র ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেও এই এক বছরে ডাকসু কাজ করেছে ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার। দেশী বিদেশী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে স্পন্সর যোগাড় করে এসব কাজ করা হয়েছে, যা ছাত্র সংসদটির কৃতিত্ব হিসেবেই মনে করছেন তারা। ভিপি সাদিক কায়েম বলেছেন, এর বাইরেও বিশ^বিদ্যালয়ের ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প উদ্বোধন হয়েছে। চীন সরকার একটা নারী শিক্ষার্থীদের জন্য হল তৈরী করে দিচ্ছে, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।
ডাকসুর কার্যক্রমের মধ্যে আরও রয়েছে বিভিন্ন সেমিনার, সামিট ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। এসব ক্ষেত্রে ডাকসুর সম্পাদকরা প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনামূল্যে বিভিন্ন কোর্সে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। একই সঙ্গে জব ফেয়ারের মাধ্যমে চীনের ৩১টিরও বেশী প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৩০ জন শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। গবেষণা ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে ৭টি প্রসিদ্ধ জার্নালে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে অ্যাক্সেসের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। অবশ্য এসব কার্যক্রমকে যেমন সাফল্য হিসেবে সমালোচনাও। সব মিলিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। বলছেন, নির্বাচনের আগে বিশাল প্রত্যাশার যে ইশতেহার দেখানো হয়েছিলো, তার অনেক কিছুই পূরণ করতে পারেনি ডাকসু।
একথা অনস্বীকার্য যে, যে বিশ^বিদ্যালয়কে এক সময় ‘ডাকাতদের গ্রাম’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন কবি আল মাহমুদ, সেই বিশ^বিদ্যালয়ে এখন উপরে বর্ণিত কর্মযজ্ঞ চলছে। বিশ^বিদ্যালয়ে ফিরে এসেছে শিক্ষার পরিবেশ। আর এটা সম্ভব করেছে জুলাই বিপ্লব, বর্তমান ডাকসু নেতৃত্ব। যে ডাকসু ছিলো এক সময় বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ’ সেটা পরিণত হয় খুনোখুনি, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির ঘাঁটিতে। যে ডাকসু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ এদেশের প্রতিটি জাতীয় সংকটে নেতৃত্ব দিয়েছে, তার ভূমিকা বদলে যায় পরবর্তী সময়ে। সত্তরের দশকের পর বিশেষ করে আশির দশকের শেষভাগ থেকে পরবর্তী সময়ে এই গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠানটির গায়ে যুক্ত হয় অপরাজনীতি ও দুর্নীতির কালো দাগ। যে ডাকসু থেকে দেশপ্রেমিক ও দূরদর্শী নেতা তৈরীর কথা ছিলো, তা এক পর্যায়ে রূপ নেয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি ও ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার হাতিয়ারে।
বলা বাহুল্য, ডাকসুর অতীতের একটি অন্ধকার অধ্যায় জুড়ে ছিলো অস্ত্রের মহড়া, সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজির মতো কলংকিত ঘটনা। নিয়মিত নির্বাচন না হওয়া এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপর দলীয় লেজুড়বৃত্তির প্রভাব ডাকসুকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের মঞ্চ থেকে বিচ্যুত করে ফেলেছিলো। ডাকসুর নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন সময়ে একশ্রেণীর ছাত্রনেতা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন, এমনকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। অনেকে হলের ডাইনিং-ক্যান্টিনের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে গেস্টরুম ও গণরুম কালচারের জন্ম দিয়েছেন। এটি কেবল একটি বিশ^বিদ্যালয়ের ক্ষতি করেনি, বরং সামগ্রিকভাবে দেশের ছাত্র রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি ধসিয়ে দিয়েছিলো। অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় রাজনীতির লেজুরবৃত্তি করতে গিয়ে একসময় ডাকসুর নেতৃবৃন্দ সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবাসন শিক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেয়ে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশী ব্যস্ত ছিলেন।
যা-ই হোক, ২৪ এর জুলাই বিপ্লব এই অন্ধকার অধ্যায়ের কালিমা বহুলাংশে দূর করতে সক্ষম হয়েছে। কল্যাণ ছাত্র রাজনীতি কাকে বলে তা দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হয়ে এই গৌরবময় ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিকে ফিরিয়ে এনেছে সুস্থ ধারায়। এ ধারাকে অব্যাহতভাবে ধরে রাখাই এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, এমনকি চ্যালেঞ্জও।





