একটি রক্তাক্ত শুক্রবার
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১:০৯:১৫ অপরাহ্ন
হুমায়ুন কবির লিটন:
দিনটি ছিল ১৯ জুলাই, ২০২৪। সিলেটের ইতিহাসে দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়; এটি রক্তে লেখা এক বেদনাময় শুক্রবার। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে তখন সিলেটসহ সারাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে। উত্তাল জনপদ যেন এক অনিবার্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের অপেক্ষায়।
আমাদের সহকর্মী তুরাব সেদিনও অন্য দিনের মতোই পেশাগত দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন । জুমআর নামাজের আগে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হয়তো তিনি জানতেন না, এটাই হবে তার জীবনের শেষ কর্মদিবস।
তার প্রথমে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এক সহকর্মীর পরামর্শে তিনি চলে আসেন সিলেটের কোর্ট পয়েন্টে। সেই সিদ্ধান্তেই শেষ পর্যন্ত তাকে ইতিহাসের এক নির্মম ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করায়।
ঘটনার সুত্রপাত হলো যে ভাবে : জুমআর নামাজ শেষে সিলেট কালেক্টরেট মসজিদ থেকে বিএনপি, জামায়াত ও ছাত্র-জনতার একটি মিছিল জিন্দাবাজারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। মিছিলটি শুর হতেই পুলিশ বেপরোয়া গুলিবর্ষণ শুরু করে। জীবন বাঁচাতে অন্য সাংবাদিকরা নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলেও তুরাব রয়ে যান ঘটনাস্থলের মাঝখানে ছবি তুলার দায়িত্ব পালন করতে। তার পরনে স্পষ্টভাবে ‘প্রেস’ লেখা ভেস্ট ছিল। কিন্তু সেই পরিচয়ও তাকে রক্ষা করতে পারেনি। পুলিশের ছুড়া গুলিতে মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন তিনি।
সহকর্মীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে রিকশায় তুলে দেন। পরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে দেওয়া হয়। ছবি এবং সংবাদ সংগ্রহে ব্যস্ত থাকায় উপস্থিত কোনো সহকর্মী তুরাবকে হাসপালে নিয়ে যান নাই। তবে একজন মানবিক পথচারী গুলিবিদ্ধ তুরাবকে পৌঁছে দেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। যদিও আজও জানতে পারি নাই সে মানুষটির পরিচয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফটোসাংবাদিক আশকার আমিন রাব্বি ফোন করে আমাকে তুরাব গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর দেন। দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি, সাংবাদিকরা ক্লান্ত, হতবিহ্বল। পুলিশ তখনও মারমুখী অবস্থানে। কিন্তু কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছিলেন না, তুরাবকে কোথায় নেওয়া হয়েছে।
একপর্যায়ে তুরাবের মোবাইল ফোনে কল দিলে একজন রিসিভ করে জানান, তাকে ওসমানী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে গিয়ে দেখি, গুলিবিদ্ধ শরীরে প্রাথমিক ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। উপস্থিত ফটোসাংবাদিক নুরুল ইসলাম, রেজা রুবেল, আজমল আলী, এমজেএইচ জামিলসহ আমরা তাকে এক্স-রে করানোর জন্য দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাই। কিছুক্ষণ পর সিলেট প্রেসক্লাবের তৎকালীন সভাপতি ইকরামুল কবির, সিলেটের ডাকের নুর আহমদ ও লবিব আহমদও হাসপাতালে পৌঁছান। এক্স-রের ফিল্ম হাতে আসতেই সবাই স্তব্ধ হয়ে যাই। তুরাবের শরীরজুড়ে ছড়িয়ে ছিল গুলির নির্মম চিহ্ন।
এরপর শুরু হয় সময়ের সঙ্গে এক অসম লড়াই: ওসমানী হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত হচ্ছিল না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তুরাবের শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছিল। সে বারবার পানি চাইছিল। আমাদের পত্রিকার সম্পাদক মুকতাবিস-উন-নূর লন্ডনে, সিইও নুরুল ইসলাম বাবুলও লন্ডনে। কী করবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। তার অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে দেখে আমি সহযোগিতার জন্য সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজের ভাইস চেয়ারম্যান এবং মহানগর জামায়াতের আমির ফখরুল ইসলামকে ফোন করি। তিনি দ্রুত তুরাবকে ইবনে সিনা হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। ভেতরে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা, বাইরে পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা সবকিছুই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। তুরাব চলে যান না ফেরার দেশে। মাত্র দুই মাস আগে নতুন জীবনের স্বপ্ন বোনা তুরাব আর ফিরলেন না। খবর পেয়ে তার বড় ভাই জাবুর হাসপাতালে ছুটে আসেন। আমাদের পত্রিকার সম্পাদনা সহকারী দাইয়ান চৌধুরী তুরাবের মা ও ভাবিকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইরত ছেলেকে দেখে মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবারের অন্য সদস্যরাও হাসপাতালে উপস্থিত হন। লাইফ সাপোর্ট দিয়ে অনেক চেষ্টা করেও ডাক্তরা ব্যর্থ হলে সন্ধ্যা ৬টা ৪৪ মিনিটে তুরাব আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চিরবিদায় নেন।
সুরতহাল রিপোর্টেও ষড়যন্ত্র করা হয় : ময়নাতদন্তের জন্য তাকে ওসমানী হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে গুলির সংখ্যা কম দেখানোসহ সুরতহাল প্রতিবেদনে নানা অসঙ্গতির অভিযোগ আছে। এ সময় তৎকালীন কোতোয়ালি থানার ওসি মাঈন উদ্দিন তুরাবের ভাই জাবুরের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে তিনি সরে যেতে বাধ্য হন।
পরদিন মানিকপীর টিলায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জানাজা। পরে বিয়ানীবাজার পৌরসভার ফতেহপুরে গ্রামের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় শেষ জানাজা। গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার আগে তার মরদেহ কিছু সময়ের জন্য রাখা হয় তার প্রিয় কর্মস্থল সিলেট প্রেসক্লাবে। সেখানে সহকর্মীরা শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা জানান। তখন তুরাব হত্যার বিচার দাবিতে দোয়া ও মানববন্ধন হলেও সরকারের চাপ কিংবা রহস্যজনক নানা কারণে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আর বড় কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি।
হত্যাকান্ডের বিচার কার্য দৃশ্যমান হয়নি: তার মৃত্যুর ছয়-সাত দিন পর অজ্ঞাতনামা পুলিশ সদস্যদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দাখিল করা হলেও সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণ না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
এর পরে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শহীদ তুরাবের ভাই জাবুর বাদী হয়ে ১৮ জনকে আসামি করে সিলেট মহানগর আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় এসএমপির বরখাস্থকৃত এডিসি গোলাম দস্তগীর ও কনস্টেবল উজ্জল গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন। মামলাটি তদন্ত করেছে প্রথমে কোতোয়ালি থানা পুলিশ পরে পিবিআই। বর্তমানে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যুনালে বিচারাধীন। ইতিমধ্যে ২ সাক্ষি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত টিম তদন্ত রিপোট প্রধান আইন কর্মকর্তার অফিসে জমা দিয়েছে। যদিও পিবিআই এখন কোন তদন্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দেয় নাই ।
২ বছর বছর পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকান্ডের দৃশ্যমান বিচার হয়নি। শহীদ তুরাবের শোকাতুর মা আজও বেঁচে আছেন ছেলের হত্যার ন্যায়বিচার নিজের চোখে দেখে যাওয়ার আশায়।
আমাদের প্রিয় সহকর্মী তুরাবের জীবন থেমে গেছে। কিন্তু থামেনি তার সহকর্মীদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে তরুণ সাংবাদিক জীবন দিলেন, তার স্মৃতি আজও সিলেটের প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি মিছিল আর প্রতিটি প্রতিবাদে আমাদের সামনে ফিরে আসে। আমরা আজও তুরাবকে খুঁজি। হয়তো খুঁজে যাব আজীবন শহীদের মিছিলে।
লেখক: মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার, দৈনিক জালালাবাদ।





