চাহিদার চেয়ে ৪৩ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ, লোডশেডিংয়ে নাকাল সিলেট
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ২:৩৪:১৯ অপরাহ্ন
গরমে অতিষ্ঠ নগরবাসী, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে স্থবিরতা

মামুন পারভেজ
চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় সিলেটজুড়ে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। শনিবার সিলেটে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২২৪ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১৮১ মেগাওয়াট। ফলে ৪৩ মেগাওয়াটের ঘাটতি তৈরি হয়। এ ঘাটতি সামাল দিতে নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং করতে হয়েছে।
সকাল থেকে রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সিলেট নগরের আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার, শাহজালাল উপশহর, টিলাগড়, মেজরটিলা, কদমতলী, কুমারপাড়া, পাঠানটুলাসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। একই চিত্র দেখা যায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। কোথাও আধা ঘণ্টা, কোথাও এক ঘণ্টা, আবার কোথাও তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
প্রচ- ভ্যাপসা গরমের মধ্যে লোডশেডিং মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বাসাবাড়িতে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েন। বিদ্যুৎ না থাকায় পানি তোলার মোটর বন্ধ হয়ে বিভিন্ন এলাকায় পানি সরবরাহেও বিঘœ ঘটে। মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া, ইন্টারনেট ব্যবহার এবং অনলাইনভিত্তিক কাজও ব্যাহত হয়।
তবে বিদ্যুৎ অফিস সূত্র বলছে, ‘অন্যান্য জেলার তুলনায় আজ (শনিবার) সিলেটে লোডশেডিংয়ের অবস্থা কিছুটা ভালো ছিল।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অন্যান্য জেলার তুলনায় আজ (শনিবার) সিলেটে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কিছুটা কম ছিল। তবে জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ঘাটতির কারণে সব এলাকাতেই বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।’
তিনি জানান, টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদিত বিদ্যুৎ ডিলিট (নষ্ট) হয়েছে। পাশাপাশি ভারতের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেখান থেকেও প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
এদিকে, সিলেটের বাসিন্দাদের অভিযোগ, পূর্বঘোষণা ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নগরের দাড়িয়াপাড়া এলাকার স্কুল শিক্ষিকা শামসুন্নাহার বলেন, ‘আজ (শনিবার) দুপুরের পর থেকে কয়েক দফায় লোডশেডিং হয়। এতে দিনভর দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পূর্ব ঘোষণা ছাড়া লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। স্বাভাবিক কার্যদিবসের তুলনায় ছুটির দিনে বিদ্যুতের চাপ কম থাকার কথা, কিন্তু ছুটির দিনে লোডশেডিং এখন আমাদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।’
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতির মুখে পড়েছে। নগরের রেস্টুরেন্ট, বেকারি, ফার্মেসি, কোল্ড স্টোরেজ, আইটি প্রতিষ্ঠান ও ছোট শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ও সেবাদানে বিঘœ ঘটে। অনেক ব্যবসায়ী জানান, বিদ্যুতের ঘন ঘন ওঠানামায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জেনারেটর চালিয়ে ব্যবসা সচল রাখতে গিয়ে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।
বন্দরবাজার এলাকার ব্যবসায়ী রুবেল আহমদ জানান, গত কয়েকদিন ধরে দিনের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে জেনারেটর দিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সচল রাখতে হচ্ছে। যার জন্য বাড়তি খরচ গুণতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদেরও ভোগান্তি কম নয়। পরীক্ষা ও ভর্তি প্রস্তুতির সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অনলাইন ক্লাস ও ফ্রিল্যান্সিং কাজেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি ঘাটতির চিত্র দেখে আমরা রীতিমতো হতাশ। এই কিছুক্ষণ আগে আমি পাম্পে গিয়েছিলাম গাড়ির তেল নিতে, সেখানে এক হাজার টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। আর লোডশেডিংয়ের কথা নাই বললাম। কোনো শিডিউল নেই পূর্ব ঘোষণা নেই, ইচ্ছে মতো বিদ্যুৎ যাচ্ছে আর আসছে। আমরা বার বার কথা বলেও এর কোনো সুরাহা হচ্ছে না। আমাদের অভিভাবক সিলেটের দুই দায়িত্বশীল মন্ত্রী এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করছি।
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন বলেন, ‘জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। তাই লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। আমরা জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাই, সেটিই বিভিন্ন সাবস্টেশনের মাধ্যমে গ্রাহকদের মধ্যে বণ্টন করি।’
জাতীয় গ্রিডের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা শুধু জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পালন করি।’






