আইনেই সীমাবদ্ধ সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ জুন ২০২৫, ১২:০১:৪১ অপরাহ্ন

তৈরি হয়নি অর্গানোগ্রাম, নেই বাজেট বরাদ্দ
তামিম মজিদ
পরিকল্পিত ও আধুনিক সিলেট নগরী গড়ার লক্ষে ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২৩। আইন পাস হওয়ার ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও কেবল কাগজে কলমে আইনেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিউক) গঠনের কাজ। তৈরি করা হয়নি সংস্থাটির অর্গানোগ্রাম, দেওয়া হয়নি বাজেট বরাদ্দ। ফলে শুরু করা যাচ্ছে না সংস্থাটির কার্যক্রম।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত সরকার শুধু কাগজে কলমে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন তৈরি করে রেখে গেছে। কিন্তু এটির কার্যক্রম চালু করতে যে আনুষাঙ্গিক কাজ প্রয়োজন, সেটা তারা করে যায়নি। এজন্য সিউকের কার্যক্রম চালু করতে দেরি হচ্ছে। প্রাথমিক কাজ শেষ হলে ২০২৬ সালের জানুয়ারি নাগাদ চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে সংস্থার কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে জানা গেছে।
নগরবাসী বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে সিলেট নগর ও আশপাশ এলাকা। এই নগরকে বাসযোগ্য করতে পরিকল্পিত নগর গড়ার বিকল্প নেই। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ রোধ ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম চালু করা খুবই প্রয়োজন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতই সংস্থা গড়ে উঠুক না কেন, যদি সিটি কর্পোরেশন ও অন্য সরকারি সংস্থার পরস্পর সমন্বয় না থাকে, তাহলে এসব সংস্থা আমাদের দেশে আসলে কোনো কাজে আসে না। এছাড়া এসব সংস্থার জবাবদিহিতাও খুব প্রয়োজন। তাহলে কেবল পরিবর্তন সম্ভব।
জানা গেছে, সুপরিকল্পিত উন্নয়ন, ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা, পর্যটন অঞ্চলের অবকাঠামো স্থাপনাসমূহ টেকসই, দৃষ্টিনন্দন ও পর্যটনবান্ধব নগরী গঠন করার লক্ষ্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকা ও এর আশাপাশের এলাকার সমন্বয়ে ২০২২ সালে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। এরই লক্ষ্যে ২০২২ সালের ২২ আগস্ট তৎকালীন মন্ত্রীসভা সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২২ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২৩’। একই বছরের ২৩ নভেম্বর আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। গেজেট প্রকাশের পর সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম শুরু করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত আশানুরুপ কোনো অগ্রগতি নেই।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকার শুধু সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন করে গেছে। কিন্তু একটি সংস্থা চালু করতে আনুষাঙ্গিক যত কাজ প্রয়োজন, সেগুলো তারা করে যায়নি। এজন্য সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম চালু করা যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম চালু করতে সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ নজরুল ইসলাম ইসলামের সভাপতিত্বে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম চালু করতে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে প্রথমেই সংস্থার অর্গানোগ্রাম তৈরির কাজ করা হবে। তারপর অর্গানোগ্রাম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে বাজেট চাওয়া হবে। বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে আগামী বছরের শুরু নাগাদ সংস্থাটির চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে। চেয়ারম্যান নিয়োগ দিলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চালু হবে।
আইন-এ বলা হয়েছে, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ও বিশেষ পর্যটন অঞ্চল আইনের অধীনে ঘোষিত পর্যটন সংরক্ষিত এলাকায় পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কোনো বহুতল ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ বা কৃত্রিম জলাধার খননের অনুমতি প্রদান করতে পারবে।
আইনে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের আওতাধীন এলাকার অনুমোদিত নকশাবহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ করলে স্থাপনা নির্মাণকারী ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ অনধিক ২ বৎসর কারাদন্ড অথবা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। আইনে আরো বলা হয়েছে, ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারি কোনো ইমারত নির্মাণ, জলাধার ভরাট বা জলাধার খননের অনুমতি প্রদান করলে তাকে ওই ইমারত বা নকশাসহ তার স্বাক্ষরিত অনুমতিপত্রের একটি অনুলিপি ইমারত বা জলাধার যে এলাকায় অবস্থিত সেই এলাকার মেয়র বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠাতে হবে।
আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম শুরু হলে পরিকল্পিতভাবে সিলেট নগর ও আশাপাশ এলাকা গড়ে উঠবে। ফলে ভবিষ্যত প্রজন্ম একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর পাবে বলে করেন নগর বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে নগর বিশেষজ্ঞ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের পূর কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোশতাক আহমদ জালালাবাদকে বলেন, যদি সরকারি সংস্থাসমূহের পারস্পারিক সমন্বয় না থাকে, তাহলে যতই নতুন সংস্থা গড়ে উঠুক, কোনো পরিবর্তন হবে না। আমাদের দেশে যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশি অভাব, সেটা হলো সমন্বয়ের অভাব। দেখা যায় সিটি কর্পোরেশনের এক দপ্তরের সঙ্গে অন্য দপ্তরের সমন্বয় নেই, অন্য সংস্থার কথা বাদই দিলাম। সুতরাং টেকসই উন্নয়ন করতে হলে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় করা জরুরি। তাহলেই কেবল পরিবর্তন সম্ভব।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত সচিব মো: আব্দুর রহমান তরফদার জালালাবাদকে বলেন, বিগত সরকার শুধুমাত্র সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইন তৈরি করে করে রেখে গেছে। শুধু আইন দিয়ে একটা সংস্থা চালু করা যায় না। আইন করার পর অর্গানোগ্রাম ও বাজেটসহ আরও কিছু কাজ থাকে। সেগুলো তৈরি করা থাকলে কার্যক্রম দ্রুত চালু করা যেত। তিনি বলেন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন নিয়ে সম্প্রতি একটি সভা করা হয়েছে। সেখানে অর্গানোগ্রাম তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা শেষ হলে বাজেট বরাদ্দ চাওয়া হবে। আশা করি, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের মধ্য নাগাদ সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম চালু করা যাবে।





