ভূমিকম্পে সারাদেশে নিহত বেড়ে ১০
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ নভেম্বর ২০২৫, ৯:২৫:৪৭ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : এক ভূমিকম্প কাঁপিয়ে দিল গোটা বাংলাদেশকে। সিলেটে কম অনুভূত হলেও ঢাকাসহ আশাপাশ এলাকায় তীব্র ঝাঁকুনি শুক্রবার সকালের এই ভূমিকম্প। এই ঝাঁকুনিকে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ বলা হচ্ছে।
সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) মাত্রা দেখাচ্ছে ৫ দশমিক ৫। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদীতে, ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।
কম্পনের ধাক্কায় অনেক ভবনের জানালার কাঁচ ভেঙে গেছে এবং অনেক জায়গায় ভবন হেলে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। বেশ কিছু ভবনের দেওয়ালে ফাটল দেখা গেছে। ঢাকা-নরসিংদীসহ দেশে নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। আহত হয়েছেন অন্তত: অর্ধ সহস্রাধিক।
ইউএসজিএস আরও জানায়, ভূমিকম্পটি ভারতীয় প্লেটের ভেতরে অগভীর গভীরতায় রিভার্স ফল্টের ফলে সংঘটিত হয়েছে। ফোকাল মেকানিজম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পূর্বমুখী মাঝারি ঢালযুক্ত একটি ফল্টে অথবা পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিমমুখী মাঝারি ঢালযুক্ত আরেকটি মাঝারি ঢালযুক্ত ফল্টে বিচ্ছেদ বা রাপচার ঘটেছে।
ইউএসজিএস-এর তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। এদিকে, এমন ভূমিকম্পের শঙ্কা বিশেষজ্ঞরা আগেই প্রকাশ করে আসছিলেন। এই ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য সজাগ হওয়ার বার্তা বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী।ভূমিকম্প-বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বেলা ১১টার দিকে বলেন, যে অঞ্চলে ভূমিকম্পটি হয়েছে, সেটি ইন্দো-বার্মা টেকটোনিক প্লেটের অংশভুক্ত। ভূমিকম্পটিতে যে তীব্র, যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে, তা তাঁর অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের পটভূমিতে এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ঢাকায় ভূমিকম্পের ফলে তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হলেও সিলেটে তা ছিল তুলনামূলকভাবে হালকা। অনেকেই টেরও পাননি। তবে ঢাকার ঝাঁকুনিতে সিলেটে নগর এলাকার বহুতল ভবনের মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।
বাংলাদেশ বা এই ভূখণ্ডে বড় ভূমিকম্পের মধ্যে আছে ১৭৬২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫। এটি ‘গ্রেট আরাকান আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। এর ফলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ফেনী, এমনকি কুমিল্লা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর ১৮৯৭ সালে আসামে সংঘটিত ভূমিকম্প ছিল ৮ দশমিক ৭ মাত্রার।১৯১৮ সালে সিলেটের বালিসিরা উপত্যকায় ৭ দশমিক ৬ মাত্রায় এবং ১৯৩০ সালে আসামের ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়।
বড় ভূমিকম্পগুলো ১৫০ বছর পরপর ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। এদিক থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ফেরত আসার সময় হয়ে গেছে। তাই গতকালের এই ভূমিকম্পের পর সবাইকে সচেতন ও সাবধান হতে হবে।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল নরসিংদী।
সারাদেশে নিহত ১০, নরসিংদীতে ৫:
ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে ঢাকাসহ সারা দেশে দুই শিশুসহ ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন যার মধ্যে শুধু নরসিংদীতেই মারা গেছেন ৫ জন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন আরো কয়েকশ মানুষ।এদিন সকালে পুরান ঢাকার কসাইটুলি এলাকার একটি ভবনের রেলিং ধসে পড়ে তিনজন নিহত হন। পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন জানান, নিহতদের সবাই ওই সময় ভবনটির নিচের রাস্তায় অবস্থান করছিলেন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (মিটফোর্ড) ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাফিউল ইসলাম, হাজী আব্দুর রহিম (৪৭) ও মেহরাব হোসেন রিমন (১২)। এদিকে, রাজধানীর মুগদার মদিনাবাগে নির্মিয়মাণ ভবনের রেলিং ধসে মো. মাকসুদ (৫০) নামের এক নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে ডোম রামু জানান, সকালে পুলিশ এসে একজনের মরদেহ রেখে যায়। তারা পরিচয় নিশ্চিত করেনি। তবে জানিয়েছে, ভূমিকম্পে তার মৃত্যু হয়েছে।নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে ফাতেমা নামের ১০ মাসের একটি শিশু নিহত হয়েছে। এ সময় শিশুটির মা কুলসুম বেগমসহ (৩০) দুজন আহত হন। এদিকে নরসিংদী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলাজুড়ে ভূমিকম্পে এক শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। নিহতরা হলেন শিবপুর উপজেলার আজকিতলা গ্রামের ফুরকান মিয়া (৪২), সদর উপজেলার গাবতলি এলাকার মৃত আবদুল আজিজের ছেলে দেলোয়ার হোসেন (৩৭), তার শিশু সন্তান ওমর মিয়া (১২) ও পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের মালিতা গ্রামের কাজম আলী (৭৫)।
মাটির ঘরের দেয়াল ধসে মারা যান বৃদ্ধ কাজম আলী ভূইয়া। আর ভূমিকম্পের আকস্মিকতায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান একই উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের নাসির উদ্দিন। পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনির হোসেন দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
নিহতদের মধ্যে ফুরকান মিয়া (৪২) ভূমিকম্পের সময় গাছ থেকে পড়ে মারাত্মক আহত হলে তাকে প্রথমে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে রেফার করা হলে পথে তার মৃত্যু হয়। শিবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. ফারজানা ইয়াছমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।নরসিংদী সিভিল সার্জন সৈয়দ আমিরুল হক জানান, আহতের মধ্যে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ৫৭ জন এবং জেলা হাসপাতালে ১৩ জনকে ভর্তি করা হয়েছে।
ভূমিকম্পটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিস) বলছে, রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৫। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাসহ আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়।ভূমিকম্পে ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুরে দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে ভূমিকম্পে ভয়ে হুড়োহুড়ি করে বহুতল ভবন থেকে নিচে নামতে গিয়ে পোশাক কারখানার শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। শ্রীপুর পৌরসভার কেওয়া পূর্বখণ্ড গ্রামের ডেনিম্যাক কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ভবনের ছাদ, ছাদের পলেস্তার, দেয়াল ইত্যাদি ধসে ও হুড়োহুড়িতে অনেকে আহত হয়েছেন।





