বিশ্ববাজারে চালের দাম কমলেও সুফল পাচ্ছেন না ভোক্তারা
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ নভেম্বর ২০২৫, ৯:০৩:১৬ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : গত এক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল ও গমের দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। অথচ বাংলাদেশের বাজারে এই দুটি নিত্যপণ্যের দাম উল্টো বেড়েই চলেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।তথ্য মতে, বাংলাদেশের গমের চাহিদার সিংহভাগ মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে। গত এক বছরে সরকারি-বেসরকারি খাত যথেষ্ট চালও আমদানি করেছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে দাম কমার কোনো সুবিধা দেশের ভোক্তারা পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে ব্যবসায়ীরা সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলে দেশের বাজারে তার সুফল পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়।
করোনা মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল। ২০২১ সালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সাথে সাথে মূল্য কিছুটা কমে আসে। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্ববাজারে গম ও অন্যান্য পণ্যের দাম আবারও বেড়ে যায়। ওই সময় বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা গম থেকে তৈরি রুটি, বিস্কুট, কেক, টোস্ট, ওয়েফারের আকার ও ওজন ছোট করে ফেলেন। পাস্তা, নুডলসের প্যাকেটে পরিমাণ কমানো হয়। হোটেলগুলো রুটি, নান, পরোটা, সিঙ্গাড়ার আকারও ছোট করে, পাশাপাশি দামও বাড়িয়ে দেয়। সেই বাড়তি দাম এখন চলমান রয়েছে।
চালের বাজার : গত ৯ নভেম্বর খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে মোটা, মাঝারি ও সরু সব ধরনের চালের পাইকারি ও খুচরা দাম বেড়েছে। খুচরা পর্যায়ে চালের দাম কেজিতে ন্যূনতম ৮৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ৪.৪৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরু চালে দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে দেশে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫১.৪৩ টাকা, মাঝারি মানের চাল ৬১.২৫ টাকা ও সরু জাতের চাল ৭২.৬৭ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এই দাম বেড়ে যথাক্রমে ৫২.২৮ টাকা, ৬২.৪৩ টাকা ও ৭৭.১০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ২০ নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে বর্তমান দাম আরও বেশি।
অথচ একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম অনেকটা কমেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে থাইল্যান্ডে প্রতি টন চালের দাম ছিল ৫৩৫ ডলার, ভারতে ছিল ৪৯৫ ডলার আর ভিয়েতনামে ছিল ৫৪৭ ডলার। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এসব দাম কমে যথাক্রমে ৩৭৪, ৩৫৪ ও ৩৫৬ ডলারে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ এই তিনটি দেশ থেকেই চাল আমদানি করে, তবু বিশ্ববাজারে দাম কমার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেশের বাজারে পড়েনি।
গম ও আটার বাজার : ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রতি কেজি গম ও আটার দাম ছিল ৪১.৩৬ টাকা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে গমের দাম বেড়ে ৪৪.০৬ টাকা ও আটা ৪৪.৯২ টাকা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় খুচরা বাজারে প্রতি কেজি গমের দাম ২.৭০ টাকা ও আটার দাম ৩.৫৬ টাকা বেড়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি টন ‘রেড সফট’ গমের দাম ছিল ২৩৩ ডলার এবং ‘রেড হার্ড’ গমের দাম ছিল ২৭২ ডলার; ইউক্রেনে ২৩৯ ডলার, রাশিয়ায় ২৩৫ ডলার ও আর্জেন্টিনায় ছিল ২৪২ ডলার। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এসব দাম কমে যথাক্রমে ২০৯, ২৩০, ২৩৫, ২৩০ ও ২১৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
খাদ্য সচিব মো. মাসুদুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে বাংলাদেশের বাজারের চাল ও গম বা আটার দামের কেনো সামঞ্জস্য নেই কেন, সে বিষয়ে কোনো অফিশিয়াল গবেষণা নেই। ফলে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করা কঠিন। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কিছু ব্যবসায়ী দাম কমাতে চান না। এছাড়া সব ব্যবসায়ীর এই দুটি পণ্য আমদানির সক্ষমতা নেই। অনেক সময় উন্মুক্ত দরপত্রেও কাঙ্ক্ষিত আমদানিকারক পাওয়া যায় না। ফলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর হাতে চলে যায়।




