শিল্প বর্জ্যরে প্রভাব: হাওরে দেশীয় মাছের আকাল
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ৯:৫৮:০৫ অপরাহ্ন
সংবাদদাতা: হাওরবেষ্টিত হবিগঞ্জ জেলায় ভরা মৌসুমেও দেশি মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে দাম ক্রেতাদের হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে। দেশি মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বাজারে মাছ উঠছে অনেক কম। বিশেষ করে চাপিলা, শিং, মাগুর, শোল, গজার, বোয়াল ও ভেদা মাছের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে হাওরের নাব্য কমে যাওয়া অন্যদিকে শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে পানি দূষণ এবং প্রজনন মৌসুমে অবৈধ জাল ব্যবহার দেশি মাছের সংখ্যা কমার বড় কারণ। জেলাজুড়ে এমন পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভরা মৌসুমেও যদি দেশীয় মাছের এমন সংকট তৈরি হয়, তা হলে ভবিষ্যতে মাছের প্রাপ্যতা ও প্রজাতি দুটিই হুমকির মুখে পড়তে পারে। সমস্যা নিরসনে এখনই শিল্প বর্জ্য জলাশয়ে ফেলা বন্ধ করার পাশাপাশি টেকসই হাওর নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া জলাশয় সংরক্ষণ এবং মৎস্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। তা না হলে হবিগঞ্জের হাওর, নদ-নদী, খাল-বিল আর মাছের ভান্ডার হয়ে থাকবে না।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক বছর থেকে হাওরে পর্যাপ্ত পানি না থাকা এবং মাছের প্রজনন মৌসুমে বৃষ্টি না হওয়াতে মাছের ডিম নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে দেশি মাছের উৎপাদন কমে গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল দিয়ে রেণু পোনা শিকার করার কারণে হাওরে মাছ কমে গেছে। তাই তাদের বাধ্য হয়েই চড়া দামে কিনে চড়া দামে বিক্রি করতে হচ্ছে মাছ। তবে চাষের মাছের সরবরাহ ভালো।
অপরদিকে ক্রেতারা বলছেন, গেল বছরের তুলনায় এ বছর দেশি মাছ হাট-বাজারে একেবারেই কম। তা ছাড়া তুলনামূলকভাবে দাম অনেক বেশি হওয়ার কারণে অনেকে কিনতে পারছেন না।দেশী মাছের বাজার হিসেবে সুপরিচিত শহরের চৌধুরী বাজারে একাধিক ক্রেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, দেশি মাছ এখন বড়লোকের পণ্য হয়ে গেছে। মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে চলে গেছে দাম। হাওরের কিংবা নদীর একটি বোয়াল মাছের কেজি ৭-৮শ টাকা এবং মাগুর মাছের কেজি ৬-৭শ টাকা। এ অবস্থায় দেশি মাছ কেনার সাহস করতে পারে না মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। অনেক সময় ছেলে-মেয়েদের বায়না চাষের মাছ দিয়ে পূরণ করেন তারা।
সরেজমিন বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, গেল বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি কেজি দেশি মাছের দাম একশ থেকে দেড়শ টাকা বেশি। হাওরের টেংরা মাছ এ বছর প্রতি কেজি ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা, চাপিলা সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, বোয়াল ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়রা মৎস্যজীবীরা জানান, শহর ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ড্রেনেজ ও বর্জ্য সরাসরি নদী এবং হাওরে ফেলায় মাছের প্রাকৃতিক বাসস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নবীগঞ্জ, বাহুবল, মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার কিছু এলাকায় শিল্প বর্জ্য নদী হয়ে হাওরে প্রবেশ করায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে প্রশাসন অভিযান চালালেও অবৈধ কারেন্ট ও চায়নাদুয়ারী জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও হবিগঞ্জের মাছ উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়া আবার কখনো অতিরিক্ত বন্যা কিংবা দীর্ঘ খারার কারণে নদী ও বিলের স্বাভাবিক পানি প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। ফলে মাছের প্রজনন সময় ও অভ্যাসেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এসব কারণে দেশি প্রজাতির মাছের উৎপাদন প্রতি বছরই কমছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফুল আলম বলেন, দেশী মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার পরও নিষিদ্ধ জালের কারণে আশাতীত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। জনসাধারণের সম্পৃক্ততা না বাড়লে দেশি মাছ বৃদ্ধি করা কঠিন হয়ে পড়বে।





