১৫ হাজার কোটি টাকার গোপন সম্পদ শনাক্ত
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৮:৫০:৫২ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা কর ফাঁকির চর্চা এখন তদন্তের আওতায় আসতে শুরু করেছে। গত এক বছরে ৩ হাজার একশোরও বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার গোপন সম্পদ ও আয় শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স।
ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স অফিসের সূত্রগুলো জানিয়েছে, আয় ও সম্পদ গোপন করায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বাণিজ্যিক গ্রুপ এবং এগুলোর পরিচালকরাও রয়েছেন। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকায় বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালক ছাড়াও ট্রাভেল এজেন্সি, ফার্ম ও ব্যবসায়ীরা রয়েছেন। এছাড়া পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিও রয়েছেন। এ তালিকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজনৈতিক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা গত আওয়ামী লীগ সরকারের সকরারের সময়ে অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছেন বলে আলোচনা রয়েছে।
এছাড়া সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা রয়েছেন, যেখানে বাদ যাননি খোদ আয়কর ও কাস্টমস বিভাগে কাজ করা কর্মকর্তা কর্মচারীরাও। শনাক্তদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডার, পুলিশ, বিচার বিভাগ, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, পাসপোর্ট অফিস, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আছেন। এছাড়া ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিকও বাদ যাননি সম্পদের গোপনের এ তালিকা থেকে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট (আইটিআইআইইউ) সূত্র জানিয়েছে, যাদের ফাঁকি উদ্ঘাটন হচ্ছে, তাদের উল্লেখযোগ্য অংশই গোপনে এসে দেনদরবার করে ট্যাক্সের টাকা পরিশোধ করে যাচ্ছেন, জানাজানি হওয়ার ভয়ে।
আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের কমিশনার মো. আবদুর রাকিব বলেন, গত এক বছরে গোপন সম্পদ ও আয় শনাক্ত হওয়ার পর ২১৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকির দায়ে মোট ৩৮০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। তিনি বলেন, আমরা এপর্যন্ত যে পরিমাণ লুকিয়ে রাখা সম্পদ ও আয়ের সন্ধান করেছি, তার পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব আয় থেকে সরকারের প্রকৃত ট্যাক্স ও জরিমানার অর্থ আদায় করা সম্ভব হলে তার পরিমাণ প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা হবে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমপক্ষে ৩ হাজার ১০০জন। তিনি বলেন, তদন্ত চলমান রয়েছে। এ সংখ্যা আরো বাড়বে।
মো. আবদুর রাকিব বলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার বর্তমান ও সাবেক অন্তত ২০০ জন ইঞ্জিনিয়ার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের গোপন করা সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ২৫ জনের বেশি দায় স্বীকার করে দাবি করা করের টাকা গোপনে পরিশোধ করে গেছেন।
অবশ্য ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স অফিস সম্পদ গোপন করায় অভিযুক্ত বা ইতিমধ্যে দায় স্বীকার করে ট্যাক্স পরিশোধ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। কর্মকর্তারা জানান, তাদের অনুসন্ধানে একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত করফাঁকির তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দেওয়া আয়ের উপর অর্থ পরিশোধ করেছে, তার মধ্যে একটির সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, যেসব ব্যক্তির সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে, তা মূলত জমি, অ্যাপার্টমেন্ট ও গাড়িতে বিনিয়োগ করা ছিল। দুদক আইন অনুযায়ী, অবৈধ সম্পদ অর্জন করলে ওই সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে এ ধরণের শাস্তির নজির খুবই বিরল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেসব অবৈধ সম্পদ উদ্ধার হয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশই অবৈধ উপায়ে অর্জিত বলে ধারণা করা যায়। কর গোয়েন্দার উচিত হবে এসব তথ্য দুদকের হাতে দেওয়া, যাতে বিস্তারিত তদন্ত করে তা বের করা যায়। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, এসব সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যারাই সহায়তা করেছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত।





