বিতর্কের মুখে দেশের আমলাতন্ত্র
প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:০২:০৮ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক: স্বাধীনতার এতদিনেও দেশের আমলাতন্ত্র বিতর্কমুক্ত হয়নি। দীর্ঘ এ সময়কালে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুশীলন কম করেছেন কর্মকর্তারা। বরং কর্তৃত্ববাদী মনোভাব দেখা গেছে তাদের মধ্যে। প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকে মাঠপ্রশাসন- সর্বত্র একই হাল। জনবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। এ থেকে সহসা নিস্তারের পথ মিলছে না। সর্বশেষ, জনপ্রশাসনের সংস্কারে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার উদ্যোগ নিলেও জমা দেওয়া সুপারিশের বাস্তবায়ন নেই।
যেসব কারণ জনপ্রশাসনকে নাগরিকদের স্বার্থে কাজ করতে দেয়নি, এর মধ্যে একটি প্রধানটি হচ্ছে দুর্নীতির বিস্তার। সরকারি কর্মকর্তারা কখনও কখনও এমন একচ্ছত্র ক্ষমতা পেয়ে যান যে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। উপরন্তু প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার কারণেই রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতিবিদদের ব্যবহার করে আমলারা দুর্নীতি করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পার পেয়ে যান। শাস্তির আওতায় আনার প্রবণতা কম থাকায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভাব বরং বাড়তে দেখা যায়।
দেশের জনপ্রশাসন সংস্কারে বিগত ৫৩ বছরে দুই ডজনের বেশি কমিশন ও কমিটি গঠিত হয়েছিল এবং বিভিন্ন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেগুলো প্রধানত দুটি কারণে পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। প্রথমত রাজনৈতিক নেতৃত্ব সব সুপারিশ গ্রহণ করেনি এবং যেসব সুপারিশ গ্রহণ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তারা আন্তরিক বা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, স্বার্থগত দ্বন্দ্বের জন্য সংশ্লিষ্ট আমলারা তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেননি।
সাবেক আমলা ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান গত মঙ্গলবার বলেছেন, ‘তারা (সরকারি কর্মকর্তা) চান তাদের সুযোগ-সুবিধা, পে-স্কেল বাড়াতে হবে, তাদের দুর্নীতির সুযোগ বাড়াতে হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ গোল্লায় যাক। এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমলাতন্ত্র একটি জগদ্দল পাথরের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা জনগণের বুকে চেপে বসে আছে। কিছুই করা যায় না এখানে। কোনো রকম মানবিক দায়িত্ববোধ আমাদের এই আমলাতন্ত্রে নেই।’ আমলারা কাজের কাজ কিছুই করছেন না অভিযোগ করে সাবেক এই আমলা বলেন, আমলাতন্ত্রই আমাদের পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভাগ্য উন্নয়নে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আমলাদের কারণে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত মন্ত্রীদের জন্য নতুন করে ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রস্তাব। পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা থাকার পরও নতুন করে বিশাল আকারের ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে থাকবে সুইমিংপুলও। এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার কারণ— মন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দকৃত বিদ্যমান ভবনে আমলাদের থাকতে পারার বাসনা। এর আগে রাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের অর্থ অপচয় করে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের অধীনে ভিভিআইপি রেস্টহাউস নির্মাণ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য- প্রধানমন্ত্রী কখনও পরিদর্শনে গেলে সেখানে বিশ্রাম নেবেন। এ রকম বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় কার্যত আমলাদের নিজ সুবিধা গ্রহণের স্বার্থে। এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক হলেও পার পেয়ে যান তারা।
এ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, কোনো রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় গিয়ে চাইলেই দুর্নীতি করতে পারেন না। কর্মকর্তারা অসহযোগিতা করলে ফাইল অনুমোদনের সুযোগ নেই। বাস্তবতা হচ্ছে- আমলাদের অনেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রচ্ছন্নভাবে রাজনীতিবিদদের উদ্বুদ্ধ করেন। এর নেপথ্য কারণ— নিজেদের অনিয়মের পথ প্রশস্ত করা। তা ছাড়া পদোন্নতি, পদায়নসহ বাড়তি সুবিধা আদায়ের প্রবণতা তো রয়েছেই। এটাও ঠিক— সরকারি কর্মচারীরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে জিম্মি। যেমন তাদের নিয়োগ, বদলি বা পদোন্নতি সব কিছুতেই রাজনীতিবিদদের মুখাপেক্ষী থাকতে হচ্ছে। কোনো সৎ ও সাহসী কর্মকর্তা নিয়মমাফিক কাজ করতে চাইলে তাকে অপছন্দের জায়গায় বদলি করা হয়। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির জন্য কর্মকর্তাদের অনৈতিক চাপ দেওয়া এবং তাতে সম্মত না হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও নতুন দৃষ্টান্ত নয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দলীয় চাপ থেকে মুক্ত করা যায়নি প্রশাসনকে। পদোন্নতি ও বদলিতে নেই গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড। দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে পছন্দের কর্মকর্তাকে পদায়ন নিয়ে ক্ষোভ ও বিতর্ক কাটছে না। তা ছাড়া পদোন্নতি বা ফিটলিস্টের জন্য সংস্থার মাধ্যমে গোপন প্রতিবেদনের চর্চিত পন্থা নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— দুটো ক্ষেত্রে দলীয়করণের অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়। প্রথমত, জনপ্রশাসনে দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দান, কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে দলীয় মতাদর্শের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদান করে নিরপেক্ষ বা ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিবঞ্চিত করে ক্রমান্বয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে বসিয়ে রাখা এবং অপছন্দের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করে তাদের সরকারি দায়িত্ব পালন থেকে সরিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, আইনানুগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তি কর্তৃক হস্তক্ষেপ এবং তাদের নির্দেশিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্মকর্তাদের বাধ্য করা। বিগত বছরগুলোয় জনপ্রশাসনে দলীয় লোকদের নিয়োগ ও দলীয় কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদান, সরকারি কর্মকাণ্ডে প্রায় সব আইনানুগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আইনানুগ সিদ্ধান্তের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত প্রদান প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ফলে দেশে আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হয়, দুর্নীতির ব্যাপকতা আরও বিস্তৃতি পায়, বিচারব্যবস্থা স্বাধীনতা হারায়, জুলুম-নির্যাতন বেড়ে যায় এবং গণতান্ত্রিক শাসনের স্থলে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সময়ে সরকার তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ব্যবহার করেছে; এমনকি জনপ্রশাসনকে দলীয়করণ করে এর পেশাদারি চরিত্র নষ্ট করেছে।
জনপ্রশাসনকে দলনিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে তিনটি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা যায়— দলীয়করণ, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়মবহির্ভূত হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতি। জনপ্রশাসনে দলীয় স্বার্থ বিবেচনায় চর্চিত রেওয়াজ হচ্ছে— বদলি ও পদোন্নতি প্রদান; দলনিরপেক্ষ, সৎ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত করা বা ওএসডি করে বিনা কাজে বসিয়ে রাখা এবং অপছন্দের কর্মকর্তাদের চাকরির ২৫ বছর পর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ইত্যাদি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে জনমুখিতা নিশ্চিত করা যায়। এ জন্য প্রশাসনিক কাঠামো, আইনি বিধিবিধান, কর্মসূচি, কর্মপদ্ধতি ও প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সবার আচরণে পরিবর্তন আনা দরকার বলে মত দিয়েছে সংস্কার কমিশন।
এসব সুপারিশ কোনো কাজে না এলেও বিসিএস অ্যাডমিন ক্যাডার অফিসারদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ভাগ হয়ে গেছে নতুন করে। এক ভাগ বিএনপি। আরেক ভাগ জামায়াত। মানে রাজনৈতিক দলে ভাগ হয়ে গেছে রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের কর্মচারীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা ছিল, আমলাতন্ত্রের সংস্কার হবে। তা হয়নি। বরং পদে পদে সৃষ্টি হয়েছে বাধা। জুলাই সনদ অনুযায়ী পুলিশ কমিশন হয়নি। কারণ প্রশাসন ক্যাডার চায় যেভাবেই হোক পুলিশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে। সম্প্রতি আটজন ইউএনওর বদলি নিয়ে বিএনপি-জামায়াত এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলেন কর্মকর্তারা। অথচ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে রাজনীতির কোনো সুযোগ নেই। অথচ তারা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন প্রকাশ্যে।





