যুক্তরাষ্ট্র বলছে আলোচনা চলছে, ইরান বলছে ‘না’
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১:৫৯:৪১ অপরাহ্ন
ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে হোয়াইট হাউস : সিএনএন
স্টাফ রিপোর্টার : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ জোরালো গলায় বলছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে প্রায় এক মাস আগে তিনি যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা শেষ করতে ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার তাঁর এ দাবি অস্বীকার করেছেন।
যুদ্ধের দামামা আর সব পক্ষের প্রচার-প্রচারণার ভিড়ে কার কথা বিশ্বাসযোগ্য, তা বোঝা কঠিন। তবে প্রতিটি পক্ষ আলোচনা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি থেকে কী পেতে পারে, তার একটি বিশ্লেষণ থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার খোলার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্প বলেছিলেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি ‘শীর্ষ’ কর্মকর্তার সঙ্গে ‘খুব ভালো’ আলোচনার পর ‘ঐকমত্যের বড় কিছু জায়গা’ তৈরি হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি ইরানকে ইতিবাচক সাড়া দিতে যে পাঁচ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তা চলতি সপ্তাহের শেয়ারবাজারের লেনদেন শেষ হওয়ার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।
অনেকে এই সময়ের বিষয়টিকে বাঁকা চোখে দেখছেন। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে গত সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলে ১২০ ডলারে উঠেছিল। ট্রাম্পের এই আলোচনার কথা বলার উদ্দেশ্য হতে পারে বাজারকে স্থিতিশীল করা।
একই সঙ্গে, ওয়াশিংটন যদি ইরানি ভূখণ্ডে কোনো ধরনের স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে এই আলোচনার খবরটি মার্কিন সেনাদের সেখানে পৌঁছানোর জন্য বাড়তি কিছু সময়ও দিতে পারে।
ট্রাম্পের উদ্দেশ্য নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ-যাঁকে অনেকে ট্রাম্পের উল্লেখ করা সেই শীর্ষ কর্মকর্তা বলে মনে করছেন। গালিবফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে চোরাবালিতে আটকে গেছে, তা থেকে বাঁচতেই এই ভুয়া খবর ছড়ানো হচ্ছে।
শেয়ারবাজার ও তেলের দামের এই প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের জন্যই নয়, ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তার ওপর নির্ভর করছে তেহরানের সুবিধা-অসুবিধা।
ইরান চায়, এই যুদ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সমস্যার মুখে পড়ুক। এর ফলে ভবিষ্যতে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর হামলার আগে অন্তত দুবার ভাববে। ফলে বাজার শান্ত করতে আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ, তেমনি আলোচনাকে অস্বীকার করে বাজারকে অস্থির রাখা এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে কোনো স্বস্তি না দেওয়াও ইরানের কৌশলের অংশ।
ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে হোয়াইট হাউস :
ইরান যুদ্ধ বন্ধের উপায় নিয়ে আলোচনার জন্য চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে পাকিস্তানে একটি বৈঠকের আয়োজন করতে কাজ করছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা। প্রশাসনের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সম্ভবত ট্রাম্প প্রশাসনের আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওই দেশটিতে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই সফরের সময়সূচী, স্থান এবং কারা উপস্থিত থাকবেন, তাতে পরিবর্তন আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানায়, পাকিস্তানে সফরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তুরস্ককেও আলোচনার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতায় পাকিস্তান অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত ১৫ দফার একটি পরিকল্পনা তারা ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। প্রস্তাবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় তুরস্কও ভূমিকা রাখছে।
প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, এই সফর-সংক্রান্ত আলোচনা আজ বুধবারও হোয়াইট হাউসে অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বর্তমানে ইরানের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে রুবিও, কুশনার ও উইটকফও এই আলোচনার জন্য বিদেশ সফরে যাবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের লাভ কী :
আলোচনা নিয়ে দুই পক্ষই যার যার মতো বয়ান দিচ্ছে। তাদের প্রকাশ্য মন্তব্য থেকে আসলে বোঝার উপায় নেই, আড়ালে কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না, হলেও তা কোন পর্যায়ে আছে। তবে এসব মন্তব্য এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, আলোচনা এবং এই মুহূর্তে যুদ্ধ শেষ হলে কার কী লাভ হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তার পরিণাম এবং ইরানের টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে তিনি সম্ভবত ভুল হিসাব করেছিলেন। গত সপ্তাহে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘তারা (ইরান) যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর ওপর এভাবে চড়াও হবে… তা কেউ ভাবেনি।’ এমনকি সেরা বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি বিশ্বাস করেননি বলে তিনি দাবি করেন।
যদিও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আগেই বারবার এমন সতর্কতা দিয়েছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প তা উপেক্ষা করেছিলেন। এখন বাস্তবতা তাঁকে সেই পরিণাম সম্পর্কে সচেতন করেছে, যা তিনি আগে পাত্তা দেননি। তাঁর কিছু মিত্র ও সমর্থক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিলেও, ট্রাম্প আগে দেখিয়েছেন, কঠিন পরিস্থিতি থেকে বের হতে তিনি আপস বা চুক্তি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রেও তেমন কিছু হওয়া অবাস্তব নয়।
ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি :
ট্রাম্প যা-ই চান না কেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন পুরোপুরি তাঁর হাতে নেই। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বার হামলার শিকার হওয়া ইরান এখন কার্যকর সমাধান ছাড়া যুদ্ধ থামাতে খুব একটা আগ্রহী নয় বলে মনে হচ্ছে। তারা চায় এমন এক দেয়াল তুলে দিতে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাদের ওপর হামলা করার সাহস না পায়।
মার্কিন স্থাপনায় আগে থেকে বার্তা দিয়ে হামলা বা ধাপে ধাপে উত্তেজনার পারদ চড়ানোর দিন এখন শেষ। শুরু থেকেই একটি বিষয় পরিষ্কার, ইরান তাদের পুরোনো কৌশল বদলেছে। এবার তারা সংযম প্রদর্শনে মোটেও আগ্রহী নয়। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা জিইয়ে রাখা তেহরানের জন্য লাভজনক হতে পারে।
ইরানের নীতিনির্ধারকদের মনে এমন বিশ্বাসও জন্মাতে পারে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত ফুরিয়ে আসছে। ফলে এখন আঘাত হানলে তা আরও কার্যকর হবে। বিশেষ করে ইরানের বর্তমান ক্ষমতায় থাকা নেতারা মনে করছেন, এখনই থেমে গিয়ে ইসরায়েলকে তাদের প্রতিরক্ষা মজুত আবার গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; ইরান নিজেও চরম ভুগছে। সরকারের তথ্যমতে, দেশজুড়ে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা হতে পারে পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু। পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও তলানিতে ঠেকেছে। ইরানের উপর্যুপরি হামলার কারণে এই সংঘাত শেষে সম্পর্ক আগের জায়গায় ফেরা দুষ্কর।




