সংকটে কৃষি খাত : দেশের ৬ সার কারখানাই বন্ধ, আমদানিও অনিশ্চিত
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৯:০৪ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সারকারখানা শাহজালাল ফার্টিলাইজারের সার উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) থেকে সার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে এই কারখানায়। ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গ্যাস সাশ্রয় করতে গত ৫ মার্চ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ রাখে সরকার। উৎপাদন বন্ধ বেসরকারি কাফকো সার কারখানায়ও। সর্বশেষ শাহজালাল সারকারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। যা চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে দেশের কৃষিখাতের জন্য। এতে দেশের সার সরবরাহ নিয়ে বড় ধরণের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ২৮ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের জরুরি সভায় আগামী ৩ মাস (এপ্রিল-জুন) রেশনিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) থেকে ফেঞ্চুগঞ্জের শাহাজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এক মাসের জন্য উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য চাপ ও অনিশ্চিয়তা বিবেচনায় দেশের সার উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। তবে মে ও জুন মাসে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এ গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে বলে জানানো হয়। শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের জি এম এডমিন সাজ্জাদুর রহমান জানান, সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকে শাহজালাল সারকারখানার উৎপাদন গত ৩ এপ্রিল দুপুরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে পাঁচটি ইউরিয়া কারখানা আছে। এগুলো হলো ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার, যমুনা ফার্টিলাইজার ও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি। এছাড়া বেসরকারিভাবে পরিচালিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডও (কাফকো) গ্যাস সংকটে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। ফলে সবগুলোর উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। বিসিআইসির তথ্য বলছে, সরকারি ৫টি কারখানার দৈনিক মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন। দেশের সরকারি পাঁচটি ও বেসরকারি একটি কারখানায় বছরে ১০ লক্ষ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন হয়।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লক্ষ টন সারের চাহিদা রয়েছে। মোট চাহিদার প্রায় সাড়ে ২৬ লক্ষ টনই লাগে ইউরিয়া সার। যার কেবল ১০ লক্ষ টন দেশে উৎপাদন হয়। যদিও কৃষিতে প্রয়োজনীয় সারের বড় অংশই আমদানি করতে হয়। তবে স্থানীয় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সারের আমদানি এবং চাহিদা পূরণ নিয়ে বাংলাদেশকে বড় শঙ্কায় ফেলেছে। এই পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন সংকটে পড়ে কিনা এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও সারের সরবরাহ নিয়ে গোটা বিশ্বের মতো চিন্তায় বাংলাদেশের কৃষকরাও।
চাহিদা মতো জ্বালানি তেল না পেয়ে বোরো মৌসুমে সেচ নিয়ে অনেক কৃষক যেমন সমস্যায় পড়েছেন, তেমনি আসন্ন আমন মৌসুমের জন্য সারের সরবরাহ নিয়েও চিন্তা বাড়ছে। মূলত সারের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব এবং কাতার থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া দেশের কারখানাগুলোতে যে সার উৎপাদন হয় সেখানেও বড় ভরসা আমদানিকৃত গ্যাস। কিন্তু উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন পুরোটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরিয়া চার লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি তিন লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি পাঁচ লাখ নয় হাজার টন এবং এমওপি মজুদ রয়েছে তিন লাখ ৪২ হাজার টন।
যদিও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলছেন, পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকায় এই মুহূর্তে সংকটের কোনো শঙ্কা নেই। আমদানিকৃত সার এখনও যতটা মজুদ আমাদের কাছে আছে, তাতে আরও মোটামুটি এক বছর চালিয়ে নেওয়া যাবে। মন্ত্রী বলছেন, এখন বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে। ফলে আগামী কয়েক মাস নতুন করে বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন পড়বে না। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে সরকারি ৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচ কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি কিংবা সারের সংকট তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে কোনো একটা সংকট তৈরি হওয়ার আগেই একটা কৃত্রিম সংকট আমরা তৈরি করে ফেলি, এটা মূল সমস্যা। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ভর্তুকি মূল্যে সার এবং কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে থাকে সরকার।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। টনপ্রতি যে সারের দাম ছিল ৪৯০ ডলার, তা এখন ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে। কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করবে। এরই মধ্যে সার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় কৃষি উৎপাদন নিয়ে সংকটে পড়েছে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের সভাপতি টম ব্র্যাডশ বলেছেন, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা কৃষি ব্যবসাগুলোকে ‘প্রচণ্ড চাপের’ মধ্যে ফেলছে। তিনি বলেন, জ্বালানি ও সারের বর্ধিত ব্যয়ভার বহন করতে এরই মধ্যে বাড়তি চাপে পড়েছেন শস্য, পশুপালন এবং দুগ্ধ খামারিরা। এদিকে, কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু সারের দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় বড় আঘাত হানতে পারে। তাদের অনুমান অনুযায়ী, এর ফলে বিশ্বব্যাপী গমের দাম চার দশমিক দুই শতাংশ এবং ফল-সবজির দাম পাঁচ দশমিক দুই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে, বৈশ্বিক এই সংকটে রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে রাশিয়া থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের উৎসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাশিয়া এখন বিশ্ববাজারে সারের বড় যোগানদাতা হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করতে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশেও লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক আমদানি করা সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এখানে কৃষি খাত জিডিপিতে প্রায় ১২-১৩ শতাংশ অবদান রাখে। কৃষি খাতের জন্য বাংলাদেশকে আমদানি করা সারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট এবং দামের ওঠানামার কারণে কৃষকদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশের আমদানি করা সারের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়।
এদিকে দেশের সব সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় আগামী আমন মৌসুমে সার যোগান নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। দেশের প্রায় ২০ শতাংশ সারের চাহিদা পূরণ করে স্থানীয় সারকারখানাগুলো। তবে এবার ইরান যুদ্ধের কারণে সার আমাদনি সীমিত এবং স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ থাকায় চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।




