হাওরে শোকের মাতম : সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে বজ্রাঘাতে নিহত ৬
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৯:২১:৪২ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় ˆবশাখী ঝড়ের কালো থাবায় আবারও নেমে এলো মৃত্যুপুরীর নীরবতা| হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে ওঠে, দমকা হাওয়ার সঙ্গে শুরু হয় বজ্রসহ বৃষ্টি| মুহূর্তের মধ্যেই বজ্রপাতের ভয়াল আঘাতে নিভে গেল ৬টি তাজা প্রাণ|
গতকাল শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, দিরাই ও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় পৃথক হাওরে এ দুর্ঘটনা ঘটে|
ঘটনাগুলো ঘটে পৃথক সময়ে, তবে একই নির্মম বাস্তবতায় জীবিকার তাগিদে হাওরে কাজ করতে গিয়ে আর ঘরে ফেরা হলো না তাদের| কেউ ছিলেন কৃষক, কেউ ছিলেন শিক্ষার্থী| পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে যারা প্রতিদিন লড়াই করতেন, তারাই আজ পরিবারের অশ্রুর কারণ!
নিহতরা হলেন, সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার হাবিবুর রহমান (২৪) ও রহমত উল্লাহ (১৩), তাহিরপুর উপজেলার আবুল কালাম (২৮), জামালগঞ্জ উপজেলার নাজমুল হোসেন (২৬) ও দিরাই উপজেলার লিটন মিয়া (৩৮) এবং হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের সুনাম উদ্দিন (৬০)|
নিহতদের ঘরে ঘরে চলছে শোকের মাতম| একজন ¯^জনের কান্নাজড়িত কণ্ঠে শোনা গেল, “সকালেও হাসিমুখে বের হয়েছিল বলেছিল বিকেলে ফিরে আসবে| এখন সে ফিরবে, কিন্তু আর কোনোদিন কথা বলবে না|”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে কৃষকরা হাওরে ধান কাটছিলেন| হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টি শুরু হয়| কাজের মাঝেই বজ্রপাতের বিকট শব্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তারা| আশেপাশের মানুষ ছুটে এলেও তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে নিঃশ্বাসহীন নিথর দেহ পড়ে থাকে হাওরের পানিতে ও ধানক্ষেতে|
আমাদের তাহিরপুর প্রতিনিধি জানান, তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরে বজ্রাঘাতে আবুল কালাম গুরুতর আহত হন| পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা ¯^াস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন| বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম|
একই সময়ে জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে নাজমুল হোসেন নিহত হন| তিনি চানপুর গ্রামের বাসিন্দা| এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বন্দে আলী|
আমাদের ধর্মপাশা প্রতিনিধি জানান, ধর্মপাশা উপজেলায় পৃথক দুটি ঘটনায় হাবিবুর রহমান ও রহমত উল্লাহ নিহত হন| হাবিবুর রহমান পাইকুরাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামের বাসিন্দা ফজলুর রহমানের ছেলে এবং বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন| রহমত উল্লাহ জয়শ্রী ইউনিয়নের সর¯^তীপুর গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল হকের ছেলে|
স্থানীয়রা জানান, হবিবুর রহমান তার চাচার সঙ্গে টগার হাওর সংলগ্ন চকিয়াচাপুর গ্রামে বোরো ধান কাটতে যান| সেখানে দুপুরের দিকে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয় এবং বজ্রপাত হলে হবিবুর রহমানসহ কয়েকজন আহত হয়| পরে গুরুতর আহতাবস্থায় হবিবুরকে ধর্মপাশা সদর হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রওনা দিলে পথে হবিবুরের মৃত্যু হয়| আহতরা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়েছেন|
অপরদিকে দুপুর একটার দিকে একই উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের সর¯^তিপুর ইসলামপুর গ্রামে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে| এতে ওই গ্রামের জয়নাল হক (৩৫), তাঁর ছেলে রহমত উল্লাহ (১৩) এবং লাল সাধুর স্ত্রী শিখা মনি (২৫) আহত হন| তাদেরকে উদ্ধার করে উপজেলা ¯^াস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে রহমত উল্লাহকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন এবং জয়নাল ও শিখা মনিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়|
ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সহিদ উল্যাহ বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের মরদেহ ¯^জনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে|
আমাদের দিরাই প্রতিনিধি জানান, দিরাই উপজেলার কালিয়াগোটা (আতরার) হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে লিটন মিয়া গুরুতর আহত হন| স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে উদ্ধার করে দিরাই উপজেলা ¯^াস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন| বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা ¯^াস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. প্রশান্ত দাস তালুকদার|
এদিকে, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে সুনাম উদ্দিন (৬০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে| মৃত সুনাম উদ্দিন ওই ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের মৃত সুন্দর আলী সাহেবের ছেলে|
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে জীবিকার তাগিদে সুনাম উদ্দিন মমিনা হাওরে ধান কাটতে যান| দুপুরের দিকে হঠাৎ আকাশ মেঘে ঢেকে গিয়ে শুরু হয় বৃষ্টি ও বজ্রপাত| এ সময় হাওরে ধান কাটার কাজে থাকা অবস্থায় বজ্রাঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়|
নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোনায়েম মিয়া জানান, বজ্রাঘাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে|
হাওর অঞ্চলে প্রতিবছরই বজ্রপাতের এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে| সচেতনতার অভাব, নিরাপদ আশ্রয়ের ¯^ল্পতা এবং হঠাৎ আবহাওয়ার পরিবর্তন-সব মিলিয়ে এখানকার মানুষ যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই জীবনযাপন করছে|
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাত থেকে বাঁচতে খোলা মাঠ বা হাওরে কাজ করার সময় সতর্ক থাকা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা এবং দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই| কিন্তু বাস্তবতা হলো- পেটের দায়ে অনেক সময় সেই সতর্কতা মানা সম্ভব হয় না|
এই ছয়টি মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়-প্রতিটি একটি করে পরিবার, একটি করে ¯^প্ন, একটি করে পৃথিবী| হাওরের বাতাসে এখন শুধু শোকের ভারী নিঃশ্বাস, আর প্রশ্ন কবে থামবে এই নিঃশব্দ মৃত্যু?




