গোলকধাঁধায় সিলেটের যাতায়াত
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৫০:১৮ অপরাহ্ন
সড়ক-রেল-আকাশ- ৩ পথেই সংকট

এমজেএইচ জামিল : সীমাহীন দুর্ভোগের বৃত্তি বন্দী হয়ে আছে সিলেট-ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা। সহসা সমাধানের সম্ভাবনা না থাকলেও-মন্ত্রীদের বক্তব্যে ঘোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে যোগাাযোগের প্রধান মাধ্যম ছয়লেনের কাজ। রাজধানী ঢাকায় যেতে সড়কে ১২-১৪ ঘণ্টার দুর্ভোগ, রেলে টিকিট পেতে হাহাকার, আর বিমানে চড়া ভাড়ার ফলে সিলেটবাসীর সামনে স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের কার্যকর বিকল্প নেই বললেই চলে। ছয় লেনের মহাসড়কের নির্মাণকাজ শেষ হতে ২০২৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগার পরিকল্পনা, রেলপথে নতুন ট্রেন চালুর অনিশ্চয়তা এবং টিকিটসংকট নিরসনে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাবে এ ভোগান্তি সহসা কাটার লক্ষণও নেই। একদিকে সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা, অন্যদিকে রেলের টিকিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বিকল্প বেছে নেওয়া- সব মিলিয়ে সময়, অর্থ ও ভোগান্তির বোঝা বইতে হচ্ছে যাত্রীদেরই। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন অসুস্থ রোগী, জরুরি কাজে রাজধানীগামী মানুষ ও বিদেশযাত্রীরা।
এদিকে সড়কপথের বিকল্প হিসেবে সিলেট-ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ চালুর ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি। ডাবল লাইন নির্মাণেও নেই কাঙ্খিত অগ্রগতি। অন্যদিকে, অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আসন শেষ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এর মধ্যে আগাম টিকিট আটকে রাখা ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গত ১২ অক্টোবর থেকে অন্যের নামে কাটা টিকিটে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হলেও টিকিটসংকট কাটেনি। ফলে সড়ক, রেল ও আকাশপথ-কোনো মাধ্যমেই নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত হচ্ছে না।
সড়কে ১২-১৪ ঘণ্টার দুর্ভোগ :
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চললেও ধীরগতির অগ্রগতি, ভাঙাচোরা সড়ক, গর্ত ও দীর্ঘ যানজটে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যান চলাচল। সিলেট থেকে ঢাকা কিংবা ঢাকা থেকে সিলেটে আসতে কখনো কখনো ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগছে। এতে কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্মাণকাজের সুফল কবে মিলবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মহাসড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা নিয়েও মন্ত্রীদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। সিলেট অংশের কাজ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা জানানো হলেও পুরো প্রকল্পের সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০২৯ সালের মাঝামাঝি। তবে সময়সীমা নিয়ে বিতর্কের বাইরে সাধারণ যাত্রীদের প্রধান প্রত্যাশা- দ্রুত কাজ শেষ করে দুর্ভোগ কমানো।
রেলের টিকিট সংকট:
সিলেট থেকে ঢাকা রুটের উপবন, কালনী, জয়ন্তিকা ও পারাবত এবং চট্টগ্রাম রুটের পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসের টিকিট পেতে ভোগান্তির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আসন শেষ হয়ে যায়। অথচ পরে বিভিন্ন মাধ্যমে বেশি দামে টিকিট পাওয়া যায়। এতে প্রশ্ন উঠেছে, সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেলেও সেগুলো কীভাবে অন্যের হাতে পৌঁছাচ্ছে।
বিষয়টি নজরে আসার পর সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল নোমান গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্বপ্রণোদিত হয়ে মিস মামলা নং-০১/২০২৬ দায়ের করেন। টিকিট কালোবাজারি ও মজুদদারির সন্দেহে করা মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), সিলেট। গত ৭ অক্টোবর মামলার নথিপত্র পিবিআইয়ের কাছে পৌঁছেছে।
এদিকে, পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই টিকিট অবৈধভাবে ব্লক করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদনে সহজ ডটকমের কর্মীদের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক ও আসন সংরক্ষণের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম ঠেকাতে গত ১২ অক্টোবর থেকে অন্যের নামে কাটা টিকিটে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। টিকিটে উল্লেখিত নামের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য না মিললে সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে ভ্রমণ করতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। গত ৮ অক্টোবর সিলেট রেলস্টেশনে জেলা প্রশাসনের অভিযানে টিকিট বিক্রি ও যাত্রীর পরিচয় যাচাইয়ে বিভিন্ন অসংগতি নজরে আসার পর এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে নতুন নিয়ম চালুর পরও টিকিটসংকটের দৃশ্যমান সমাধান মেলেনি। সিলেটে বড় ধরনের অভিযান বা টিকিট অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের নজিরও এখন পর্যন্ত সীমিত। ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে টিকিট কালোবাজারির দায়ে একজনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযানে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
যাত্রীদের মতে, শুধু পরিচয় যাচাই করে অনিয়ম ঠেকানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়। অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর পরপরই আসন শেষ হয়ে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান, টিকিট বণ্টনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কালোবাজারির অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সাধারণ যাত্রীরা যাতে সহজে ও ন্যায্য দামে টিকিট কিনতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত রেল কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার।
ঘোষণা আছে, চালু হয়নি ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ :
সিলেট-ঢাকা রেলপথে যাত্রীদের চাপ কমাতে ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে ট্রেনটির যাত্রা শুরু হয়নি। সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ট্রেনটি চালুর কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু ঘোষিত সময় পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ইঞ্জিনের স্বল্পতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতাকে বিলম্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা-সিলেট রেলপথে ডাবল লাইন নির্মাণেও কাঙ্খিত অগ্রগতি নেই। ফলে বিদ্যমান ট্রেনের ওপরই যাত্রীদের চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়। অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়। এতে ট্রেনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগও বাড়ছে।
নতুন ট্রেন চালুর ঘোষণা বাস্তবায়ন, ডাবল লাইন নির্মাণে গতি আনা এবং বিদ্যমান ট্রেনের আসন ও সেবার সক্ষমতা বাড়ানো না হলে রেলপথের ওপর যাত্রীদের আস্থা বাড়ানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে রেলপথে যাত্রীদের চাপ ও টিকিটসংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আকাশপথেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ :
সড়কের দীর্ঘ যানজট ও রেলের টিকিটসংকট এড়াতে অনেকে দ্রুত যাতায়াতের জন্য আকাশপথ বেছে নিতে চান। কিন্তু সিলেট-ঢাকা রুটে বিমানভাড়া অনেক যাত্রীর সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। বুকিংয়ের সময়, ভ্রমণের তারিখ ও আসনপ্রাপ্যতার ওপর ভাড়া নির্ভর করলেও যাত্রীদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় সাশ্রয়ী ভাড়ায় টিকিট পাওয়া কঠিন।
বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা, ব্যবসায়িক কাজ কিংবা বিদেশযাত্রার প্রয়োজনে ঢাকায় যেতে হলে অনেকের সামনে বিকল্প সীমিত হয়ে পড়ে। সড়কপথে দীর্ঘ সময় ব্যয় এবং রেলপথে টিকিট না পাওয়ার কারণে বিমান কার্যকর বিকল্প হতে পারে। কিন্তু উচ্চ ভাড়ার কারণে সেই সুযোগ সবার নাগালে নেই। ফলে দ্রুত যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকলেও তা সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়ে উঠছে না।
পর্যটন ও অর্থনীতিতেও প্রভাব :
প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পর্যটন সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, হামহাম জলপ্রপাত ও মাধবপুর লেকের মতো পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থার দুর্ভোগ পর্যটক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
সড়কে দীর্ঘ যানজটের কারণে যাত্রার সময় ও ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। রেলপথে টিকিট না পাওয়ায় অনেককে বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর আকাশপথের উচ্চ ভাড়া পর্যটকসহ সাধারণ যাত্রীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়িক যোগাযোগ, পর্যটন পরিকল্পনা এবং জরুরি প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াতের ওপরও।
সিলেটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ঘোষণা নয়, চলমান প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা, রেলসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করার দিকেও নজর দিতে হবে।
সমন্বিত উদ্যোগই প্রত্যাশা:
সিলেটবাসীর যাতায়াতের সংকট কোনো একটি পরিবহনমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। সড়কে দীর্ঘ যানজট, রেলে টিকিটের অনিশ্চয়তা এবং আকাশপথে উচ্চ ভাড়া-সব মিলিয়ে যাত্রীদের সামনে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিকল্প সীমিত হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ট্রেন চালুর বিলম্ব এবং রেলপথের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধীরগতি।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মহাসড়কের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, সিলেট অংশের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা, ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’ চালুর ঘোষণা বাস্তবায়ন, ডাবল লাইন নির্মাণে গতি আনা এবং টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি আকাশপথে সাশ্রয়ী ভাড়ার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
সিলেটবাসীর প্রত্যাশা, যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার পাশাপাশি দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করবে সরকার। কারণ, যোগাযোগের দুর্ভোগ শুধু যাত্রাপথের ভোগান্তি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সময়, অর্থ, চিকিৎসাসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং সিলেট অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশ।





