কিশোরগ্যাংয়ের কৌশল বদল
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৬:০১:৫৪ অপরাহ্ন
*অভিযানে গা-ঢাকা * নেপথ্যের ‘বড় ভাই’রা আড়ালে*

এমজেএইচ জামিল : সিলেটে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে চাপে পড়ে কৌশল বদলাচ্ছে অপরাধীরা, আড়ালে থাকার চেষ্টা করছে সদস্যরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারও কঠোর অবস্থানে গিয়ে সারাদেশে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের প্রশ্রয় ও নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে কিশোর গ্যাং দমনের অভিযান মাঠের চুনোপুঁটিদের ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, সিলেট নগরীর পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক সেবন, মারামারি, নারীদের উত্ত্যক্ত করা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে কিশোরেরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব গ্যাংয়ের একাংশকে ব্যবহার করছে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কথিত গডফাদাররা। কখনো তুচ্ছ বিরোধ, কখনো দলীয় সংঘাত, আবার কখনো আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে সহিংসতা। একেকটি ঘটনার পর অভিযান জোরদার হলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৭ জুলাই ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে নগরীর কাজিরবাজার সেতুর ওপর ছুরিকাঘাতে খুন হয় কিশোর রিফাত আহমদ (১৫)। রাত ১০টার দিকে একদল কিশোরের হামলায় প্রাণ হারায় সে। রিফাত নগরীর খাসদবির এলাকার দারুস সালাম বন্ধন জি-৩ বাসার মিফতাহ উদ্দিনের ছেলে এবং স্থানীয় দ্বীপশিখা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। তুচ্ছ বিরোধে কিশোরের এমন মৃত্যু সিলেটে কিশোর অপরাধের ভয়াবহতা সামনে নিয়ে আসে। কিশোরগ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে গত কয়েকমাসে অপহরণসহ একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এক সপ্তাহে আটক তিন শতাধিক :
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ ও নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গত এক সপ্তাহে বিশেষ অভিযান চালায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)। অভিযানে তিন শতাধিক কিশোরকে আটক করা হয়। গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে এসএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই শেষে ১৭০ জনের অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নিয়ে তাঁদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযানে সিলেটের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী আটক হয়েছেন, তাঁদের নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১৩০ জনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। আটক কিশোরদের অপরাধে সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের পাশাপাশি তাদের পেছনে কারা রয়েছে, অর্থের জোগান কোথা থেকে আসছে এবং কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের ব্যবহার করছেন কি না, তা খতিয়ে দেখাও জরুরি।
সিলেটে সক্রিয় ১৫টি গ্যাং :
পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এর মধ্যে সিলেটে ১৫টি গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে সাতটি গ্যাং রয়েছে। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ২৫টি গ্যাংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে নোয়াখালীতে। অন্যদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ১৫৯টি গ্রুপ রয়েছে।
সিলেটের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় দলবদ্ধভাবে চলাফেরা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, বিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান করে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, মাদক সেবন, ছিনতাই, তীর-জুয়া ও মারামারির অভিযোগ রয়েছে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোকসমাগম বাড়ানো কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর কাজেও কিশোরদের ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থের জোগান, প্রশ্রয় ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া এসব গোষ্ঠীকে বেপরোয়া করে তুলছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মাঠে কিশোর, আড়ালে নিয়ন্ত্রক:
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক করা হলেও নেপথ্যে থাকা কথিত ‘গডফাদার’দের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যক্তি কিশোরদের দিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। কোনো ঘটনা ঘটলে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা আটক হলেও নেপথ্যের নির্দেশদাতা ও পৃষ্ঠপোষকেরা অনেক সময় আড়ালেই থেকে যান।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্দিষ্ট ঘটনা ও ব্যক্তির ক্ষেত্রে তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে কিশোর গ্যাং দমনে কার্যকর ফল পেতে হলে শুধু সদস্যদের আটক করে দায় শেষ করলে চলবে না। অপরাধে অর্থের জোগানদাতা, আশ্রয়দাতা, নির্দেশদাতা এবং প্রভাব খাটিয়ে তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করতে হবে। অন্যথায়, আটক সদস্যদের জায়গায় নতুন কিশোর যুক্ত হয়ে একই অপরাধচক্র আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
প্রতিরোধে উপজেলা পর্যায়ে কমিটি :
কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে সারাদেশে উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সোমবার (১৯ অক্টোবর) মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কমিটির সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সদস্যসচিব থাকবেন।
মাঠপর্যায়ে কিশোর অপরাধীদের চিহ্নিত করা, গ্যাং সংস্কৃতির মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধ এবং দ্রুত আইনি ও সামাজিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। কমিটি অপরাধপ্রবণ কিশোরদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরামর্শ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় করবে।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির কার্যপরিধি বাড়িয়ে কিশোর গ্যাং, হত্যা, ছিনতাই, অপহরণ ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে এ উদ্যোগকে আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অভিযান নয়, চাই নেপথ্যের শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা :
কিশোর গ্যাং দমনে অভিযান জরুরি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের অপরাধ থেকে ফেরাতে কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এ কাজে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া কিশোরেরা পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছে কি না, তারও খোঁজ রাখতে হবে।
সিলেটে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের সাফল্য শুধু কতজনকে আটক করা হলো, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। অপরাধের পুনরাবৃত্তি বন্ধ, নতুন গ্যাং গড়ে ওঠা ঠেকানো এবং নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনার মধ্য দিয়েই এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হবে। রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের প্রশ্রয় বন্ধ করা না গেলে কিশোর গ্যাং দমনের অভিযান সাময়িক চাপ তৈরি করলেও স্থায়ী সমাধান অধরাই থেকে যেতে পারে।
পূজার পরই ফের অ্যাকশন :
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে কিশোরগ্যাং বিরোধী অভিযান সাময়িক বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর-প্রশাসন) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম।
তিনি দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, অভিযানের পর অনেকেই গাঁ ডাকা দিয়েছিল। কিন্তু দুর্গাপূজা উপলক্ষে চক্রটি আবারও সক্রিয় হয়েছে। বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। পূজা শেষ হলে আবারও বড়ধরণের অভিযান শুরু হবে। কিশোরগ্যাংয়ের পাশাপাশি তাদের প্রশ্রয়দাতাদেরও গ্রেফতার করা হবে। এ ব্যাপারে কোন ছাড় দেয়া হবেনা বলেও জানান তিনি।





