কাজের অপেক্ষায় লাখ লাখ তরুণ, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগে বিশ্বব্যাংক
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৬:১৯:৩১ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশে গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ। বিপরীতে, এ সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। ফলে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ কর্মী তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেছেন, বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ব্যাপক পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করতে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের তরুণদের কর্মসংস্থান, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে এসব কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ সালের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা শেষে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা জানতে সংস্থাটির কাছে প্রশ্ন পাঠানো হয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেহরিন আহমেদ মাহবুবের পাঠানো লিখিত জবাবে জ্যঁ পেসমে বলেন, গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা এককোটি ৪০ লাখ তরুণের বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। অর্থাৎ, কর্মক্ষম বয়সী তরুণদের একটি বড় অংশ কাজের সুযোগ পাননি। তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নারীদের বাধা তুলনামূলক বেশি। ২০২২ সালে বাংলাদেশের নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উন্নতি করতে অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে তিনটি ক্ষেত্রে ঘাটতি দূর করা জরুরি—দক্ষতা, অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা।
দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে জ্যঁ পেসমে বলেন, নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। এ জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়ানো এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম কর্মশক্তি গড়ে তুলতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডর-কেন্দ্রিক উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অবকাঠামো সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন বাড়াতে পারে এবং নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের প্রয়োজন মেটাতে বেসরকারি বিনিয়োগকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। জ্যঁ পেসমে বলেন, কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি প্রয়োজন। বেসরকারি বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পূর্বশর্ত হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। অর্থাৎ, নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক বাধা কমানোর কথা বলেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, নিয়মকানুন সহজ করা, বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) বাধা কমানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মী নিয়োগ সহজ হবে বলে মনে করে সংস্থাটি।
জ্যঁ পেসমের ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কার—এই পদক্ষেপগুলো সম্মিলিতভাবে আরও বেশি ও উন্নত মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানোর সুযোগও বাড়বে।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের সহযোগিতার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে নতুন কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক (সিপিএফ) তৈরির কাজ চলছে। জ্যঁ পেসমে বলেন, এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য হবে বেসরকারি খাতে ব্যাপক পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা। সংস্থাটির জবাবে বলা হয়, মূলত কর্মসংস্থান সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কাঠামোগত বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।






