সিলেটে ‘হৃদয়ে’ লেখা রূপকথা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৯:৫৭ অপরাহ্ন
বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট
স্পোর্টস রিপোর্টার : সিলেটের সবুজ গালিচায় শনিবার শুধু ব্যাট চলেনি, লেখা হয়েছে রূপকথার এক কাব্য। যখন এক প্রান্ত থেকে ভেঙে পড়ছিল আশার মিনার, তখন তৌহিদ হৃদয় একাই হয়ে উঠলেন দৃঢ় এক পাহাড়। ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ২৪২ রানের এক মহাকাব্যিক অপরাজিত ইনিংস তিনি খেললেন, আর বাংলাদেশকে উপহার দিলেন স্বস্তির লিড।
পরশু যখন ব্যাট হাতে মাঠে নামলেন হৃদয়, বাংলাদেশ তখন ২২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বিপদে। দলের অবস্থা তখন অনেকটা ডুবন্ত নৌকার মতো। হৃদয় নিজেও খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। শুরুতে তাঁকে দেখে মনে হয়নি, এই ইনিংসের শেষে এমন একটা মহাকাব্য লেখা হবে।
তবু হাল ছাড়েননি। উইকেটে পড়ে থেকেছেন। প্রথম দিনটা শেষ করেছেন ২৯ রানে অপরাজিত থেকে।
তারপর সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে পরিস্থিতি। পাল্টেছে হৃদয়ের ব্যাটিংও। কখনো রক্ষণে অবিচল, কখনো আক্রমণে দুরন্ত। বল বুঝে খেলেছেন। বাউন্ডারি পাওয়ার সুযোগ এলে হাতছাড়া করেননি। সিলেটের গ্যালারিতে করতালি বেড়েছে। ড্রেসিংরুমে সতীর্থরা উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছেন। ইবাদত হোসেন তো মাঝপথেই জানিয়ে দিয়েছেন কুর্নিশ।
হৃদয়ের ইনিংসের বিবর্তনটা বোঝার জন্য কয়েকটি সংখ্যা দেখা যেতে পারে। প্রথম ৫০ রান করতে খেলেছেন ১০৯ বল, সময় লেগেছে ১৭৮ মিনিট। সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে পরের ৬২ বলে লেগেছে ৮০ মিনিট। দেড়শ করতে আরও ৬৪ বল, ৬৭ মিনিট। সেখান থেকে ডাবল সেঞ্চুরি। অর্থাৎ যত সময় গড়িয়েছে, হৃদয়ের ব্যাট তত দ্রুত কথা বলেছে।
টেস্ট ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি কেবল একটি ব্যক্তিগত মাইলফলক নয়। এটি একজন ব্যাটসম্যানের ধৈর্য, সামর্থ্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই করে যাওয়ার অসাধারণ সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কীর্তি গড়েছেন মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের মতো তারকারা।
এবার সেই গৌরবময় ইতিহাসের নিজের নাম লেখালেন তাওহিদ হৃদয়। ব্যাট হাতে একের পর এক বাঁধা পেরিয়ে তিনিও জায়গা করে নিয়েছেন ডাবল সেঞ্চুরির এলিট ক্লাবে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এটাই ছিল হৃদয়ের প্রথম সেঞ্চুরি। সেটাকেই তিনি রূপান্তর করেছেন ডাবল সেঞ্চুরি। এখানেও সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন হৃদয়। টেস্টে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপান্তর করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার তিনি। এর আগে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি ইনিংসে সর্বোচ্চ ১৮১ রান করার রেকর্ড ছিল মুমিনুল হকের।
তানকিন আহমেদ আউট হলে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস। তবে অপরাজিত থেকেই মাঠ ছাড়েন হৃদয়। শেষ পর্যন্ত ৩৫৯ বল খেলে ২৪২ রান করেন তিনি। এই ইনিংস দিয়ে মুশফিক-তামিমদের পেছনে ফেলেছেন হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলার রেকর্ড এখন হৃদয়ের দখলে। এর আগে এই রেকর্ড ছিল মুশফিকের দখলে। ২১৯ রানের অপরাজিত ইনিংস ছিল তার।
তাওহি হৃদয়ের ২৪১ রানের এই ইনিংসটি সাজানো ছিল ১১টি ছক্কায়। এখানেও একটি রেকর্ড গড়েছেন তিনি। টেস্টের এক ইনিংসে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ড এখন তার দখলে। টেস্টে তার চেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ড আছে কেবল ওয়াসিম আকরাম ও যশস্বী জয়সোয়ালের (১২টি করে)। তবে বাংলাদেশিদের মধ্যে টেস্টে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডে সবার ওপরে হৃদয়।
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে থেমেছে ৩৮৬ রানে। যেখানে হৃদয় একাই করেছে ২৪২ রান। শতাংশের হিসাবে যা ৬২.৬৯ শতাংশ। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ অবদান। এর আগে সর্বোচ্চ ছিল ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪৩ রানে অলআউট হওয়া ইনিংসে লিটনের ২৫ (৫৮.১৩%)।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২য় ইনিংস: ৪ ওভারে ৭/০ (কিং ৫*, সিলভা ২*; তাসকিন ০/৭, হাসান ০/০, তাইজুল ০/০)।
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ১১১.৫ ওভারে ৩৮৬ (হৃদয় ২৪২*, মুশফিক ৩৪, তাইজুল ২২, নাজমুল ১৮, মিরাজ ১৬, তানজিদ ১৬, তাসকিন ১২, লিটন ৮; ওয়ারিক্যান ৪/১০৪, সিলস ২/৫৮, চেজ ১/৬৬, জোসেফ ১/৮২,গ্রিভস ১/১০)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ৩৫৬।





