বিষয়টি গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ণ
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৫:১০ অপরাহ্ন

সম্প্রতি এক মতবিনিময়কালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্তলাল সেন বলেছেন, আমাদের দেশের অর্ধেক লোক বিদেশে চিকিৎসার জন্য যায় প্রপার ইনভেস্টিগেশন হয় না দেখে। তারা দেখে এক জায়গায় এক রিপোর্ট, আরেক জায়গায় আরেক রিপোর্ট। আমরা যদি টেকনোলজিটা শক্ত করতে পারি তাহলে সমস্যাটা থাকে না। কারণ একজন চিকিৎসককে রোগীর চিকিৎসার জন্য টেকনোলজির উপর নির্ভর করতে হয়। রিপোর্ট সঠিক না হলে সঠিক চিকিৎসা দেয়া কখনো সম্ভব নয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী অত্যন্ত সত্য ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন তার বক্তব্যে। বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে বিশেষভাবে ভারতে যাওয়া অধিকাংশ ব্যক্তিরই একটি অভিযোগঃ বাংলাদেশের চিকিৎসকরা প্রায়ই রোগ ধরতে পারেন না অর্থাৎ সঠিক রোগ নির্ণয়ে প্রায়শঃ ব্যর্থ তারা। এ অবস্থায় এদেশের বিপুল সংখ্যক রোগীকে বাধ্য হয়ে বিদেশে যেতে হয় চিকিৎসার জন্য। আর হাই প্রোফাইল ব্যক্তিরা সামান্য অসুখ বিসুখ ও চেকআপের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকার সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত ব্যয়ে বিদেশে যান চিকিৎসার জন্য। এতে দেশ থেকে বেরিয়ে যায় কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এমনও দেখা গেছে কোন রোগীর একটি বেনাইন বা নির্দোষ টিউমার হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক এটিকে ক্যান্সারাস অর্থাৎ রোগী ক্যান্সারে আক্রান্ত বলে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে বিদেশ গিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হলে দেখা যায় রোগীর টিউমারটি ক্যান্সারাস বা ক্যান্সার আক্রান্ত নয়। সামান্য কিছু ওষুধ কিংবা ছোটখাটো অপারেশনের মাধ্যমেই এই অসুস্থতা থেকে রেহাই পান। সরকারী হাসপাতালের ডায়গনস্টিক বা প্যাথলজিক্যাল সেন্টার বা বিভাগে যেমন দক্ষ প্যাথলজিস্ট বা চিকিৎসক টেকনেশিয়ান নেই তেমনি ঘাটতি রয়েছে অত্যাধুনিক চিকিৎসা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির। অনেক ডায়াগনস্টিক বা প্যাথলজিক্যাল সেন্টারের বিরুদ্ধে কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে এদেশে। এভাবে একশ্রেণীর চিকিৎসক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনিয়ম ও গাফিলতির কারণে এদেশের মানুষের মনে আস্থাহীন অভাব সৃষ্টি হয়েছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
গত মার্চ মাসে এ নিয়ে মিডিয়ায় সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজের প্যাথলজি বিভাগঃ জিম্মি ১০ বছর, কোটি কোটি টাকা হরিলুট’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (সামেক) প্যাথলজি বিভাগকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হরিলুট করে সম্পদের পাহাড় তৈরী করেছে হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী প্যাথলজিস্ট সুব্রত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদকে কৌশলে জিম্মি করে প্যাথলজি বিভাগের ক্যাশ কাউন্টারের রশিদ ছাড়াই প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ শতাধিক রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। রশীদ ছাড়া এই অর্থ সুব্রতর কাছে গেলে এর ভাগ পান হাসপাতালের পরিচালক, উপ-পরিচালক ও প্যাথলজিস্ট। এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি যেখানে সেখানে প্যাথলজিক্যাল টেস্ট কতটা সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, এ নিয়ে প্রশ্ন জাগার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এর আগে চট্টগ্রামের ৪ ক্লিনিক প্যাথলজি বন্ধের নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন। জানা যায়, হাসপাতালের লাইসেন্সসহ কোন কাগজপত্র না থাকা, পরিবেশের ছাড়পত্র না থাকা, অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ইত্যাদি কারণে এই ৪ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়। এছাড়া গত মার্চে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক এক বিশেষ অভিযানে একটি প্যাথলজি ও ডায়গনস্টিক সেন্টার বন্ধ ও বাকীদের সতর্ক করা হয়। লাইসেন্স না থাকা ও নানা অনিয়ম পরিলক্ষিত হয় এগুলোতে।
যা-ই হোক, এতসব অনিয়ম ও অসঙ্গতি ও দুর্বলতা-অদক্ষতা নিয়ে যখন এদেশে হাজার হাজার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগগুলো চলছে, তখন এগুলোর ওপর দেশের মানুষ বিশেষভাবে রোগীদের অবস্থায় ঘাটতি ও দুর্বলতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এ অবস্থায় রোগীরা বিদেশমুখী হলে তাদের দোষ দেয়া মোটেই সংগত ও যৌক্তিক নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে আলোকপাত করেছেন, যা অতীতে স্বাস্থ্যবিভাগের কোন হর্তাকর্তাকে করতে দেখা যায়নি। আশা করি, এই জাতীয় সমস্যাটি দুরীকরণে তিনি কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যা দেশের গণস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সৃষ্টি করবে।



