ভারতের নিষেধাজ্ঞার প্রভাব স্থলবন্দরে
প্রকাশিত হয়েছে : ২০ মে ২০২৫, ১২:০৫:০৬ অপরাহ্ন
শেওলাসহ বিভিন্ন বন্দরে রপ্তানিতে ভাটা ♦ আজ জরুরী সভা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে

জালালাবাদ রিপোর্ট: ভারত স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য, ফলের রস, তুলা, কাঠের আসবাবপত্র ইত্যাদি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে গত ১৭ মে। এরপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সিলেটের শেওলা, সাতক্ষীরার ভোমরা ও আখাউড়াসহ বিভিন্ন স্থলবন্দরে। তবে এই নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চলছে।
অনেকেই এটি বাংলাদেশের বিষয়ে ‘ভারতের একটি কড়া পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। দুই দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে কেউ কেউ এটিকে দেখছেন ‘পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ’ হিসেবেও।
তবে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ থেকে আমদানিতে নতুন যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে তাতে ভারতের ব্যবসায়ীরা ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য উদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন।
ভারত এর আগে গত মাসের শুরুতে তৃতীয় দেশে রপ্তানি পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলো। এরপর বাংলাদেশও স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সূতা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিলো।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন আবার স্থলবন্দর ব্যবহারে বিধিনিষেধ প্রয়োগের এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে তাতে বাংলাদেশি পণ্যের রফতানি আরও জটিল ও বাধাগ্রস্ত হবে। যদিও এতে ভারতীয় আমদানিকারকরাও ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে তারা কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।
বাংলাদেশ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যই বেশি। পাশাপাশি ছিলো বিভিন্ন কোম্পানির প্লাস্টিক পণ্য ও আসবাব সামগ্রী। আবার আমদানির বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করেছে ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য।
ভোমরা স্থল বন্দর একদিনেই রপ্তানি নামল ২ লাখ ডলারে :
ভারতের আমদানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থল বন্দরে। একদিনের ব্যবধানে বন্দর দিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি মূল্য ১৩ লাখ ডলার থেকে নেমে এসেছে আড়াই লাখ ডলারের নিচে। ভোমরা কাস্টমস স্টেশন সূত্রে জানা যায়, ১৭ মে বন্দর দিয়ে ভারতে ১০৬ ট্রাকে ৮৩৫ দশমিক ৪৪৬ মেট্রিক টন পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল ৩২ ট্রাক জুট ইয়ার্ন, ১৫ ট্রাক খাদ্যপণ্য (টোস্ট, জুস, চিপস, লিচু), চার ট্রাক ইয়ার্ন ওয়েস্ট, দুই ট্রাক ক্যাপ, নয় ট্রাক রেডিমেড গার্মেন্টস, ৩২ ট্রাক ট্রাভেল ব্যাগ এবং দুই ট্রাক ফার্নিচার। রপ্তানির মোট মূল্য ছিল ১৩ লাখ ৪৪ হাজার ৩ মার্কিন ডলার।
কিন্তু ১৮ মে, ভারতের নিষেধাজ্ঞার পর বন্দর দিয়ে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ২৮ ট্রাকে, ২৭৫ দশমিক ৭৬৩ মেট্রিক টন পণ্যে। রপ্তানিকৃত পণ্যের মধ্যে ছিল তিন ট্রাক ইয়ার্ন ওয়েস্ট, দুই ট্রাক রিপ্রোসেসড প্লাস্টিক, তিন ট্রাক কটন নিটেড ফেব্রিক্স, ১২ ট্রাক জুট ইয়ার্ন এবং আট ট্রাক ট্রাভেল ব্যাগ। এদিনের রপ্তানির মূল্য ছিল মাত্র দুই লাখ ৪৩ হাজার ৯৪৬ মার্কিন ডলার। ভোমরা স্থল বন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা রাসেল আহমেদ বলেন, ১৭ মে ভারত সরকার বেশ কিছু পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর ফলে গার্মেন্টস ও প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
শেওলা স্থলবন্দরে রপ্তানিতে অচলাবস্থা :
সিলেটের শেওলা স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা পণ্যগুলোর রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। রোববার সকাল থেকে ভারতের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি এই বন্দর থেকে। এদিন পণ্যবাহী ১১টি ট্রাক বন্দরে আটকা পড়ে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। এতে করে ওই স্থলবন্দরে রপ্তানিতে এক প্রকার অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
তবে রপ্তানি বন্ধ থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ায় ব্যবসায়ীরা কোনো পণ্য বন্দরে পাঠাচ্ছেন না। ফলে রপ্তানিযোগ্য পণ্যবাহী কোনো গাড়ি সোমবার বন্দরে আটকা নেই বলে জানিয়েছেন শেওলা স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক মাহবুব হাসান।
এদিকে ভারতের অনুমতি থাকায় সোমবার মেলামাইন পণ্যের একটি চালান রপ্তানির জন্য ভারতে প্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে। শেওলা স্থলবন্দরের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, রোববার রপ্তানির জন্য আসা বেশ কিছু পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে আটকা পড়ে। শুধু কেমিক্যাল পণ্যবাহী একটি ট্রাক শেওলা বন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। এরপর আজ আরও দুই ট্রাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এগুলো রপ্তানিতে ভারতের অনুমতি আছে বলে জানা গেছে।
আখাউড়া স্থলবন্দরে অর্ধেকে নেমেছে রপ্তানি :
স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের বেশকিছু পণ্য রপ্তানিতে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞায় লোকসানের মুখে পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দরের রপ্তানি বাণিজ্য। নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিনে হিমায়িত মাছ, ভোজ্যতেল ও পাটের তৈরি রশি ছাড়া আর কিছু রপ্তানি হয়নি। অর্ধেকে নেমেছে রপ্তানি বাণিজ্য। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেসব পণ্যের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তার বেশিরভাগই রপ্তানি হতো এই বন্দর দিয়ে। এতে প্রতিদিন এই বন্দর দিয়ে অন্তত ৩০-৪০ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হবে।
আখাউড়া স্থলবন্দর সূত্রে জানা যায়, দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী এই স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের ‘সেভেন সিস্টারস’ খ্যাত সাতটি রাজ্যে প্রতিদিন হিমায়িত মাছ, শুঁটকি, ভোজ্যতেল, তোলা বর্জ্য, প্লাস্টিক পণ্য, পিভিসি সামগ্রী, প্রক্রিয়াজাত খাবারসহ ১২ ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের বেশকিছু পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত সরকার। এতে নতুন করে সংকটে পড়েছে বন্দরের রপ্তানি বাণিজ্য। নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাক ও কাঠের ফার্নিচার ছাড়া তোলা বর্জ্য, প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্লাস্টিক পণ্যসহ পিভিসি পাইপ রপ্তানি হতো এই বন্দর দিয়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন পণ্য এই বন্দর দিয়ে রপ্তানির জন্য আসেনি। তবে ৪৪ টন হিমায়িত মাছ, ১৩৫ টন ভোজ্যতেল ও ১৯ টন পাটরশি ভারতে রপ্তানি হয়েছে।
জরুরী সভা ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় :
বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে পোশাক প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য প্লাস্টিকসহ প্রায় সাত ধরনের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ভারত। এ বিষয় করণীয় ঠিক করতে আজ মঙ্গলবার জরুরী সভা ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থলবন্দরের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসমূহ এবং আশুকরণীয় নির্ধারণে বাণিজ্য সচিবের সভাপতিত্বে বিকেল ৪টায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে।
সভায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।
এছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিদের উপস্থিতির জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এদিকে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, বিষয়টি নিতান্তই অর্থনৈতিক নয়, বরং এতে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে এ সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলছেন, ভারতে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ বেশি নয় এটি সত্যি, কিন্তু বাংলাদেশের মোট রফতানির অনুপাতে সেটি আবার একেবারে কমও নয়। ফলে ভারতের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বাণিজ্যে প্রভাব ফেলবে। কারণ আমাদের বাজার ও পণ্য বৈচিত্র্য কম। ভারতে যেসব পণ্য রফতানি হয় তার অধিকাংশই উন্নত দেশে রফতানি সম্ভব হবে না।






