আ‘লীগের ভোট পেতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নীরব কৌশল
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:০০:১৩ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক : গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তবে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগকে গণহত্যার দায়ে নির্বাচনের বাইরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিলেও দলটির সমর্থকদের ভোট পক্ষে নিতে চায় প্রতিদ্বন্দ্বী সব দল। এ পরিস্থিতিতে আসনভিত্তিক নীরব প্রতিযোগিতা ও নানা কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছেন।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ একাধিক দল মনে করছে, নিজেদের সমর্থকদের বাইরে আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসলে নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের ভোট টানতে বিভিন্ন কৌশল নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, কোথাও মামলা-নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। ভোটের প্রচার শুরু হলে আরও নানা কৌশল প্রকাশ পেতে পারে।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে, “যে নির্বাচনে নৌকা নেই, সেই নির্বাচনে ভোট নয়।” আওয়ামী লীগের মিত্র ১৪-দলীয় জোটও এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলের কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ হয়তো ভোট দিতে যাবে না। এরপরও আওয়ামী লীগের নীরব সমর্থক ভোটারকে কেন্দ্রে এনে নিজের পক্ষে রাখতে পারলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর সম্ভাবনা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পেতে পারে।
১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা হয়। ওই চার নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পেয়েছে ৩০.০৮ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৭.৪৪ শতাংশ, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০.১৩ শতাংশ এবং ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪৮.০৪ শতাংশ।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল ব্যাপক কারচুপিপূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতনের পর দলটির ভোট আসলে কত—সেটা এখন কারও পক্ষে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাসহ অধিকাংশ নেতা পলাতক অথবা কারাগারে রয়েছেন। সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাও একই অবস্থায় রয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এই পরিস্থিতি আওয়ামী লীগের জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অনিয়ম এবং জবরদখলের অভিযোগ ছিল, যা জনগণের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের ভোট কারা পাবে তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, যদি কোনো প্রার্থী দলটির আদর্শের কাছাকাছি থাকে, তবে ভোটাররা তাদেরকে সমর্থন দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট আসনে ভোটারদের সঙ্গে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রার্থী বা তাঁদের কর্মীরা আওয়ামী লীগের কর্মীদের প্রতি কতটা বৈরী আচরণ করেছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয়ভাবে যদি কোনো নির্দেশনা আসে, তবে সেটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী শক্তি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা উপলব্ধি করেছেন যে, তাদের দলটির পক্ষে থাকা ঠিক হবে না। ফলে দেশপ্রেমিক ভোটাররা বিএনপির মতো স্বাধীনতার ঘোষকের দলটির পাশে অবস্থান করবে। গ্রামীণ এলাকায় সামাজিক মিটমাট বা রিকনসিলিয়েশন হয়ে গেছে, শহরে হয়তো তা কম হয়েছে। এখন ভোটকে কেন্দ্র করে দল-মতনির্বিশেষে সবাই ব্যস্ত।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় থেকে রাজনৈতিক মহলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আওয়ামী লীগের ভোট পেতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। বিভিন্ন দল বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে—কোথাও মামলা তুলে নেওয়া বা নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এধরনের কৌশল গণতন্ত্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
হিন্দুধর্মাবলম্বী ভোটারদের প্রভাবও প্রতিটি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বে আওয়ামী লীগের নেতা হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটের ওপর নির্ভর করতেন। এবার বিএনপি ও জামায়াত সংখ্যালঘু ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করে প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে। খুলনা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হচ্ছেন ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দী। কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে মনোনীত হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের শ্যালক কর্নেল (অব.) জিহাদ খান।
বাগেরহাট-১ (ফকিরহাট-মোল্লাহাট-চিতলমারী) আসনে বিএনপি প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল, বাগেরহাট-৪ (শরণখোলা-মোরেলগঞ্জ) আসনে সোমনাথ দে—দুইজনেই আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব। সোমনাথ দে মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সভাপতি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি।
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া) আসনে বিএনপি মনোনীত করেছেন ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন আহমেদ, যিনি আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটে অংশ নেওয়া দলগুলো নিজেদের মতো করে আওয়ামী লীগের ভোটারদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে। এতে সফল হলে একদিকে ভোটের হার বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হবে।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বিচ্ছিন্নভাবে ভোট দিতে পারেন। এটা অল্প ভোটের ব্যবধানের মধ্যে যেসব আসনে ফল নির্ধারণ করে, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এর আগেও স্বাধীনতার পর মুসলিম লীগের এবং এরশাদের পতনের পর জাতীয় পার্টি ভোট টানার চেষ্টা করেছে। এবারও আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে টানাটানি স্বাভাবিক।





