বরাদ্দ কমছে মেগা প্রকল্পে!
প্রকাশিত হয়েছে : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০৫:১৩ অপরাহ্ন
ঢাকা-সিলেট চার লেনে কমছে ৫৫ কোটি, পাস হতে পারে আজকের এনইসি সভায়

জালালাবাদ রিপোর্ট : এবারও বড় বড় প্রকল্পের টাকা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এই বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বড় ১০টি প্রকল্প থেকে সব মিলিয়ে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি কমানো হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) সরকারের ব্যয় সংকোচনের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে দেশের মেগাপ্রকল্পগুলোর ওপর। অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির প্রভাব পড়েছে দেশের বেশির ভাগ বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে। তাই সংশোধিত এডিপিতে একযোগে আটটি মেগাপ্রকল্পের বরাদ্দ কমানো হয়েছে ১২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা।
শীর্ষ ১০টি প্রকল্পের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ কমছে না। আর ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বরাদ্দ বাড়ছে। আর সিলেট-ঢাকা মহাসড়কসহ বাকি ৮টি প্রকল্পের বরাদ্দ করা টাকা কমানো হচ্ছে। প্রত্যাশিত হারে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংশোধিত এডিপিতে এসব প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সরকারের সম্পদ বা রাজস্বঘাটতিও আছে।
বরাদ্দ কমানোর বড় প্রকল্পের তালিকায় আছে ঢাকা-সিলেট চার লেন সড়ক নির্মাণ; মেট্রোরেল (এমআরটি-৬); মেট্রোরেল (এমআরটি-১); এমআরটি-৫ উত্তরাংশ; সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে রংপুর পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণ; মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন; হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্প।
আজ সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি পাস হতে পারে। এনইসি সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করবেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বড় বড় প্রকল্প বছরের শুরুতে বরাদ্দ দিলেও বছরের বাকি সময়ে পুরো অর্থ খরচ করা সম্ভব নয়। বাস্তবায়নের হার সন্তোষজনক না হওয়ায় বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতিও ভালো নয়। তাই এডিপি কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ছোট-বড় প্রকল্পসহ এডিপির আকার কমানোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক-দুটি কারণই আছে। এ বছর প্রকল্পের বাস্তবায়ন অন্য বছরের চেয়েও শ্লথগতিতে আছে। আবার কোনো কোনো প্রকল্পে এত দিন অপ্রয়োজনীয় বা কম প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ ছিল, তা সংশোধিত এডিপিতে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট চার লেন সড়ক প্রকল্পেও বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। মূল এডিপি থেকে কমছে ৫৫ কোটি টাকা। আরএডিপিতে বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এডিপিতে প্রকল্পে ১ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।
বিমানবন্দর থেকে রামপুরা হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত এবং পূর্বাচল থেকে নতুনবাজার পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণের প্রকল্পটি এমআরটি-১ নামে পরিচিত। এই প্রকল্পে চলতি এডিপিতে ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু সংশোধিত এডিপিতে এই বরাদ্দ ৮০১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হচ্ছে। কমানো হচ্ছে ৭ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। বরাদ্দ কমছে ৯১ শতাংশ।অন্যদিকে উত্তরা থেকে মিরপুর হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল হচ্ছে। এখন মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এই প্রকল্পে এ বছর বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। এখন তা কমিয়ে ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা করা হচ্ছে। এমআরটি-৫-এ বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। এখন তা কমিয়ে করা হচ্ছে ৫৯২ কোটি টাকা।মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে এ বছর বরাদ্দ আছে ৪ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের বরাদ্দ ৭৩ শতাংশ কমিয়ে করা হচ্ছে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প কমানো হচ্ছে ৭৩৩ কোটি টাকা। এই প্রকল্প বরাদ্দ থাকছে ৩০৬ কোটি টাকা। বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পে ২৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ কমিয়ে রাখা হচ্ছে মাত্র ১৬৮ কোটি টাকা।
এছাড়া সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নয়নে কেটে নেওয়া হচ্ছে ৩১০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বরাদ্দ ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প দেশের অন্যতম বড় প্রকল্প। এই প্রকল্পে এ বছর সংশোধিত এডিপিতে কোনো টাকা কমানো হচ্ছে না। মূল এডিপিতে বরাদ্দ রাখা ১০ হাজার ১১ কোটি টাকাই রাখা হচ্ছে।
তবে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বাড়তি টাকা দিয়ে প্রকল্পটি শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প মূল এডিপির সঙ্গে আরও ১ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা যোগ করা হচ্ছে। ফলে সংশোধিত এডিপিতে এই প্রকল্পে বরাদ্দ থাকছে ৪ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের এডিপি থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রতিবারের মতো এবারও এই কাটছাঁটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, এনইসি সভায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার ২ লাখ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হতে পারে। চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নেওয়া হয়েছিল। এর মানে হলো, এবার ৩০ হাজার কোটি টাকা কমছে।
চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির অর্থের মধ্যে স্থানীয় উৎস থেকে জোগান দেওয়া হয় হবে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এটি কমিয়ে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে।আর মূল এডিপিতে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে আছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এটি কমিয়ে ৭২ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। বর্তমান এডিপিতে ১ হাজার ১৭১টি প্রকল্প আছে।
গত বছর সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) আকার সবচেয়ে বেশি কমানো হয়েছিল। গতবার ৪৯ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়। গত বছর সংশোধিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।





