ফল মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৮:০৬:৩৮ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : গত বছরের চেয়ে চলতি রমজানে ৬৭ হাজার টন বেশি টন ফল আমদানি হলেও বাজারে চড়া ফলমূলের দাম। রমজানের আগে সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার পরও দাম না কমে গত রমজানের চেয়ে এই রমজান মাসে ফলের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশ। দরিদ্র-নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের কাছে ফল এখন বিলাসী পণ্য।
আমদানিকারক ও পাইকাররা আমদানি মূল্য এবং পরিবহন খরচ বাড়ানোর দোহাই দিলেও ক্রেতাদের অভিযোগ, রমজান ঘিরে সিন্ডিকেট ব্যবসার পুরোনো রূপই ফিরে এসেছে বাজারে। গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা যৌক্তিক মুনাফার বদলে অতি-মুনাফার দিকে ঝুঁকছেন। ফলের বাজার ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকারকে ফলের আমদানি মূল্য ও বিক্রির তথ্য খতিয়ে দেখতে হবে।
নগরীর বন্দরবাজার ফলের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, ভালো মানের আপেল এখন বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায়, যা সপ্তাহখানেক আগেও ছিল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকার মধ্যে। গত বছর এ সময় কেজি ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। মাল্টা ও কমলার ক্ষেত্রেও একই চিত্র, কেজি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে বেচাকেনা হচ্ছে। চার-পাঁচ দিন আগে অন্তত ৩০ টাকা কমে কেনা গেছে ফল দুটি। গত বছর রোজার শুরুতে মাল্টা ও কমলার কেজি ছিল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা। আঙ্গুরের দাম আরও বেশি। প্রিমিয়াম জাতের আঙ্গুর প্রতি কেজিতে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে ক্রেতাকে। যদিও গত বছরের এ সময় আঙ্গুরের কেজি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে ছিল। বেদানা ৪০০ টাকা থেকে ৫৫০টাকা, স্ট্রবেরি ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে এখনও সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি খেজুরে। সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক হার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার পর আমদানি দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু শুল্ক কমানোর সুবিধা ক্রেতা পর্যায়ে পৌঁছেনি। গত চার-পাঁচ দিনে কেজিতে ৩০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে খেজুরের দাম। গত বছরের তুলনায় কেজিতে বেড়েছে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ফলে আমদানি করা প্রিমিয়াম মানের খেজুর এখন ক্রেতার নাগালের বাইরে।
বাজারে সাধারণ মানের খেজুরের কেজি গত বছর ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার খরচ হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। জাহেদি খেজুরের কেজি ২৬০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ ধরনের খেজুরের কেজি ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। দামি খেজুরের মধ্যে মেডজুলের কেজি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকায়, যা গত বছর ছিল এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩৫০ টাকা। আজওয়া ও মরিয়ম জাতের খেজুরের কেজি ৯০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ সময় এই দুই জাতের খেজুর কেনা গেছে ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকায়।
এদিকে শুধু বিদেশি ফল নয়, দেশি ফলেরও দাম বেড়েছে। তরমুজ ও কলার চাহিদা তুঙ্গে। পিস হিসেবে তরমুজ বিক্রির বদলে সব জায়গায় প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর কেজি কেনা গেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। বাংলা কলার ডজন কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। চার-পাঁচ দিন আগেও এ জাতের কলা কেনা গেছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে। যা গত রোজার তুলনায় অন্তত ২০ টাকা বেশি। গত বছরে রোজায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি হয়েছিল।
কলার ডজনেও গত বছরের তুলনায় ১০ থেকে ৪০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। প্রতি ডজন সবরি কলা বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায়। তুলনামূলক কম দর চম্পা কলার। প্রতি ডজন কেনা যাচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। পাকা পেঁপের দরও বেড়েছে। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা দরে। গত বছর যা ছিল ৮০ থেকে ১৫০ টাকা। কিছুটা কমে মিলছে আনারস। আকারভেদে প্রতি পিস কেনা যাচ্ছে ৩০ থেকে ৬০ টাকায়। গত বছর দর ছিল ৫০ থেকে ৭০ টাকা।
তথ্য মতে, গত বছর এ সময়ে দেশে দুই লাখ ১৩ হাজার ৬০৭ টন ফল আমদানি হয়েছিল। এ বছর আমদানি হয়েছে দুই লাখ ৮০ হাজার ৯৪৪ টন। সেই হিসেবে ৬৭ হাজার টন বেশি ফল আমদানি হয়েছে চলতি বছর। প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ফল আমদানি করা হলেও খুচরা বাজারে দাম অনেক চড়া। গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি কেজির দাম অন্তত ৩০ শতাংশ বেশি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৭৫৭ কোটি টাকা মূল্যের ৮৬ হাজার ৯৯১ টন আপেল, ৫২০ কোটি টাকা মূল্যের ৪৪ হাজার ৪৫৬ টন আঙ্গুর, ৪৩৮ কোটি টাকা মূল্যের ৫০ হাজার ৩১৬ টন মাল্টা এবং ৪৯৬ কোটি টাকা মূল্যের ৫৬ হাজার ৯৯৫ টন কমলা আমদানি করা হয়। ৯২৬ কোটি টাকা মূল্যের ৪১ হাজার ১৮৬ টন খেজুর খালাস হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে।
দাম বাড়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ মাসে একদিনও ফল খেতে পারেন না বলে জানিয়েছেন অনেকে। বেসরকারি চাকরিজীবী আহসান উদ্দিন খান বলেন, এমন কোনো ফল নেই যেটির দাম বাড়েনি। যেখানে দু-তিন কেজি করে ফল কিনি, সেখানে এখন এক কেজির বেশি কেনা কষ্টকর। পুরোনো সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে। তাদের লাগাম না টানলে সাধারণ মানুষের বিপদ বাড়বে।
এ ব্যাপারে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিযেশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজানে দেশি-বিদেশি সব ফলের দাম বেশি। বিশেষ করে খেজুরের দাম লাগামহীন। বিদেশি ফলের আমদানি ব্যয় কত আর পাইকারি পর্যায়ে সেগুলো কত দামে বিক্রি হচ্ছে তা যাচাই করা দরকার। নতুন সরকার যদি এখনই বাজারের লাগাম টানতে না পারে তাহলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।





