শহীদ তুরাব : কথা ফুরানো আগে যার দম ফুরিয়ে গেল
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:১৫:০৭ অপরাহ্ন
মুনশী ইকবাল:

তুরাব খুবই দুরন্ত ছিল। অনেক মজা করতো। বিয়ানীবাজারে মফস্বল সাংবাদিকতা থেকে ২০১৭ সালের দিকে দৈনিক জালালাবাদে যোগ দিয়ে শুরুতে ফটো সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতো। তখন আমার সাথে অনেক অ্যাসাইনমেন্টে সে তার ক্যামেরা নিয়ে সঙ্গী হয়। সেই দিনগুলো আজ মনে পড়ছে। তার অনেক ছবির ক্যাপশন এবং ছবির কাজ সে আমাকে দিয়ে করিয়ে নিতো। তারপর সে ধীরে ধীরে নিজেকে আরও মেলে ধরতে শুরু করে। সময়ের ব্যবধানে সে একটি জাতীয় দৈনিকের ব্যুারো সামলানোর দায়িত্ব পালন করে যেতে সক্ষম হয়।
মৃত্যু এক অনিবার্য বাস্তবতা। জীবনের এই রঙ্গমঞ্চ এক অদ্ভুত ব্যাপার। এখানে কথা ফুরানোর আগে দম ফুরিয়ে যায়। তেমনি এক বেদনাবিধুর মৃত্যু সংবাদ আমরা পেলাম সহকর্মী আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব (এ টি এম তুরাব) এর। মেহেদির রং শুকানোর আগে ফুরিয়ে গেল তার জীবনের প্রদীপ।
মৃত্যুর আগের দিকে এসে তার আগেকার অনেক অভ্যাস ও স্বভাবের মধ্যে পরিবর্তন চলে আসে। একসময়ের উড়নচণ্ডী তুরাব অনেক স্থির ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়। তার স্বভাবে একটা দৃঢ়তা ফুটে ওঠে। এতকিছুর পরও তুরাবের মধ্যে একটা শিশুসুলভ স্বভাব থেকে যেত। সে সব সময় একটা একসাইটেডের মধ্যে থাকতো। কোনো কাজ সফলভাবে করতে পারলে বা কোনো দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরলে শিশুদের মতো উচ্ছ্বসিত হতো।
সর্বশেষ মৃত্যুর আগেরদিন কোটা আন্দোলন চলাকালে শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের ছিটাগুলি একটি স্প্রিন্টার তা গাঁ ছুয়ে চলে যায়। সন্ধ্যায় অফিসের সোফায় বসে সে আমাকে সেই কথা জানায় এবং বিপদ থেকে যে বেঁচে গেছে এজন্য খুব উচ্ছসিত ছিল। কিন্তু এধরনের স্পিøন্টার খুব মারাত্মক হয়, ভেতরে রক্তক্ষরণ করে, ভবিষ্যতে নানান শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। তাই তুরাবের বিপদ থেকে ফিরে আসায় খুশি হলেও তার মতো উচ্ছ্বসিত তখন হতে পারিনি। আমি তাকে বলি এই ঝামেলা শেষ হলে সে যেন আমার চেম্বারে আসে, স্পিøন্টারের জন্য ওষুধ দেবো। সে খুশি হয়, তুরাব এর আগেও আমার চেম্বারে এসেছিল এবং চিকিৎসা ও পরামর্শ নিয়েছিল। জালালাবাদ এর অভ্যর্থনা কক্ষের এই সোফায় বসে তুরাবের সাথে অনেক কথা ও স্মৃতি জড়িত। এই সোফায় বসেই তুরাব তার অনেক না বলা কথা আমার সাথে শেয়ার করতো। যে কথাগুলো পেশাদার সাংবাদিকতা বা পত্রিকার জীবনে নতুনদের জন্য অনেকটা অবধারিত হয়ে গেছে। কারা তাকে পছন্দ বা পরামর্শ দিতেন, কারা তার পেছনে লাগতেন বা একটি ভালো রিপোর্ট করে প্রশংসার চেয়ে সমালোচনা করতেন আবার কারা উৎসাহ দিতেন সব গল্প করতো।
১৮ জুলাই সন্ধ্যায় তার সাথে স্প্রিটার নিয়ে যেকথা সেটিই ছিল আমাদের একসাথে শেষ বসা। রাতে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় তাকে তার ডেস্কে কাজ করা অবস্থায় রেখেই আমি বেরিয়ে যাই। কে জানতো এটাই তার সাথে শেষ দেখা। পরদিন শুক্রবার দুপুরের দিকে সিনিয়র সহকর্মী নিজাম উদ্দীন সালেহ ভাই ফোনে জানান তুরাব পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে ওসমানী হাসপাতালে, একই সময় সম্পাদনা সহকারী দাইয়ান চৌধুরী ভাইও কল দেন।
আমি তখন ডিউটিতে ছিলাম। দ্রুত কাজ শেষে করে বের হলাম। ওসমানী হাসপাতালের পথে রওয়ানা দেওয়ার সময় আরেক সহকর্মী এমজেএইচ জামিল ভাইকে কল দিই। তিনি জানান তুরাবের অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউ এর জন্য ইবনে সিনা হাসপাতাল সোবহানীঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে আমি দিক পরিবর্তন করে বন্দরবাজার অভিমুখে রওয়ানা দিই। পুরো রাস্তা ফাঁকা, এক দুটো রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশা যাই দেখা যাচ্ছে তা যাত্রী ভরা। পড়ন্ত দুপুরের কড়া রোদে গা তেতিয়ে উঠছে। আগের রাত থেকে শরীরও সায় দিচ্ছিলো না খুব একটা। রিকশা-সিএনজি না পেয়ে বাইক আছে এরকম কয়েকজনকে ফোন দিলাম। কিন্তু কেউই রাজি হলেন না বাসা থেকে বের হতে। অনেকে বললেন হাসপাতালে আছে আর চিন্তা কী? এখন যা করার ডাক্তার করবে, আপনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে খোঁজ নিতে পারবেন। কিন্তু একজন পেশাদার সংবাদকর্মীর জন্য তার সহকর্মীর এই অবস্থায় এরকম পরামর্শ মেনে চলা বেশ কঠিন। আমার বেলায়ও তাই হলো। অফিসে আমার ডেস্কের দুই ডেস্ক পরেই তুরাব বসে। আগেরদিন দেখে এলাম তরতাজা মানুষ আজ গুলিবিদ্ধ তাও আইসিইউতে নিতে হয়েছে এরকম অবস্থায় কীভাবে মনকে মানাই। তাই রিকাবীবাজার পয়েন্টে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলাম যদি কোনো বাহন পাই। অবশেষে একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা পাই। চালক আমাকে নিতে রাজি হন।
আমি সিএনজি করে ইবনে সিনার দিকে আসার জন্য রওয়ানা দিয়ে ক্বীনব্রিজের মুখে সুরমা পয়েন্টে নেমে যেতে বাধ্য হলাম। কারণ জেলা পরিষদ থেকে বাকি রাস্তা র্যাব ও পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। বন্দর পয়েন্টে পুলিশের সাথে কোটা আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ চলছে। থেমে থেমে আসছে পুলিশের গুলির শব্দ। কীভাবে এই রণক্ষেত্র হয়ে সোবহানীঘাট যাবো চিন্তা করলাম। এসময় দেখতে পেলাম আমার পত্রিকা অফিস যে বিল্ডিংয়ে সেই কুদরত উল্লাহ মসজিদ কমপ্লেক্সের বোডিং ম্যানেজার মতিউর রহমান হাতে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে দাঁড়ানো। তিনিও তার কর্মক্ষেত্রে যাবেন। আমাকে দেখে তিনি কিছুটা সাহস পেলেন। বললেন চলুন আল্লাহর নাম করে দুই ভাই দেখি কতটুকু যাওয়া যায়। জেলা পরিষদ থেকে কুদরত উল্লাহ মসজিদ কমপ্লেক্স মাত্র কয়েক গজের দূরত্ব। তারপর জেলা পরিষদের দেওয়াল ঘেষে কোনো রকমে কুদরত উল্লাহ মসজিদ কমপ্লেক্স পর্যন্ত গিয়ে আর এগুনো সম্ভব হলো না। আমি কিছুক্ষণ এখানে অবস্থান করে চেষ্টা করলাম পেছন দিকে হকার মার্কেট হয়ে কাস্টঘর দিয়ে সোবহানীঘাট পৌঁছাবো। কিন্তু শুক্রবার থাকায় সেদিন হকার মার্কেট বন্ধ থাকায় তাদের সবগুলো গেইট বন্ধ ছিল। ফলে সেদিকেও যাওয়া সম্ভব হলো না। এরপর অপেক্ষা করলাম আসরের আজান পর্যন্ত যদি সংর্ঘষ থামে তাহলে অন্তত লালদিঘি হয়ে পেছনদিকে ইবনে সিনা যাবো। কিন্তু আজানের পর আবার নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হলো। এদিকে দীর্ঘ পথ ঘুরে এবং তীব্র গরমে অসুস্থ বোধ করছিলাম। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম মাগরিবের পর পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে বের হবো। কিন্তু এরপর মাগরিবের দিকে শুনলাম মেহেদির রং শুকানোর আগেই পুলিশের গুলিতে জীবন প্রদীপ নিভে গেছে আমাদের সহকর্মী এটিএম তুরাবের। অত্যাধিক গুলির কারণে ডাক্তাররা তাকে বাঁচাতে পারেন নাই। এমতাবস্থায় ইবনে সিনায় চিকিৎসারত অবস্থায় সন্ধ্যা ৬টা ৪৪ মিনিটে তুরাব শাহাদাত বরণ করে।
সিলেটের যেসব সংবাদকর্মীর পুলিশের সাথে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ ও সখ্যতা, তুরাব তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সেই সূত্রে সে পুলিশের পরিচিত থাকাই স্বাভাবিক। ফলে যেকোনো পরিস্থিতিতে সবার আগে পুলিশের তাকে চেনার কথা।
তুরাব নিহতের ঘটনায় যে পুলিশ কর্মকর্তা সাদেক কাওসার দস্তগীরের নাম শোনা যায় সেই দস্তগীরেরও সে পরিচিত। দস্তগীর এর আগে যখন এসএমপির কোতোয়ালি থাকার সহকারী কমিশনার তখন থেকে তার সাথে তুরাবের সখ্যতার কথা আমি তুরাবের মুখেই শুনেছি।
তুরাব ছিল পুলিশ বান্ধব একজন সংবাদ কর্মী। একবার একটি হত্যা মামলার তদন্তকালে এক সহকারী কমিশনার পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার সাথে আমার বাকবিতন্ডা হয়। সেই কর্মকর্তার রহস্যময় আচরণ আমাকে বিস্মিত করে। অফিসে এসে এটা আমি ওর সাথে শেয়ার করি কারণ এই কর্মকর্তার সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। বলি যে বিষয়টি আমি শক্তভাবে দেখবো, তোমার সম্পর্ক তাই তোমাকে জানালাম। তখন তুরাব আমার থেকে সময় নেয় এবং জানায় ঐ কর্মকর্তা তার ভুল স্বীকার করেছেন। সেসময় ঐ কর্মকর্তার রুমে যুক্তরাজ্য প্রবাসী এক আওয়ামীলীগ নেতা পরবর্তীতে যিনি জনপ্রতিনিধি হয়েছিলেন তার এক চামুণ্ডা উপস্থিত ছিলেন। ঐ লোক সকাল থেকে নাকি নানান তদবিরে সেই অফিসারের মেজাজ নষ্ট করে দিয়েছিল। আমার যেহেতু নিয়মিত থানায় যাইনা তাই সেই অফিসার বিষয়টি বুঝতে পারেন নি।
তুরাব সবসময় মাঠে ময়দানে বিচরণ করে বেড়াতো বিধায় নানান ধাচের পুলিশের সাথে তার পরিচয় ছিল। ফলে যেকোনো পরিস্থিতিতে তাকে সবার আগে পুলিশের চেনার কথা। কিন্তু তুরাবের ঘনিষ্টজন পুলিশের গুলিতেই একেবারে কাছ থেকে তুরাব আহত হওয়ার খবর আসলেই অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক।
মাত্র আড়াই মাস আগে বিয়ে করে তুরাব। ১২ মে ২০২৪ রোববার রাতে শহরতলীর একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টে তুরাবের সেই বিয়ের অনুষ্ঠানের স্মৃতি এখনও চোখে জ¦লজ¦ল করছে। মাত্র আড়াই মাস পর ১৯ জুলাই জুমাবার মেহেদির লাল রঙে রাঙা তুরাবের শরীর রক্তে লাল হবে তা একেবারেই প্রত্যাশার অতীত।
ইংল্যান্ড প্রবাসী নববধু বিয়ের একমাস পর ইংল্যান্ড চলে যান। কিছুদিন পর তুরাবেরও ইংল্যান্ড চলে যাওয়ার কথা ছিল। তুরাবের ইন্তেকালের আগে অফিসে তার সেই ইংল্যান্ড প্রবাস নিয়ে মজা করছিলাম। দৈনিক নয়া দিগন্তের ঢাকা অফিসের রিপোর্টার আমাদের সাবেক সহকর্মী আবুল কালাম ভাই সিলেট এসেছেন। কালাম ভাই সিলেটের মানুষ। সিলেট এলেই তিনি সুযোগ পেলে সাবেক কর্মক্ষেত্রে একবার ঘুরে যান। সেদিন সন্ধ্যায় কালাম ভাই তুরাবের কম্পিউটারেই কিছুক্ষণ কাজ করলেন। এরপর উঠে বললেন আপনাদের তুরাব তো ক’দিন পরই প্রবাসী হয়ে যাবে, তখন তো আপনারা একা হয়ে যাবেন। আমরা হাসলাম। তুরাব চলে যাবে কিন্তু এভাবে চলে যাবে তা চিন্তায়ই আসেনি।
লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক জালালাবাদ।





