জালালাবাদ কালজয়ী হোক
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ আগস্ট ২০২৬, ২:০৭:২৮ অপরাহ্ন

সালেহ আহমদ খসরু
চৌত্রিশ বছরে পড়েছে আজ দৈনিক জালালাবাদ-এটি এক অপার আনন্দ তার পাঠক কলাকুশলী প্রকাশক ও শুভানুধ্যায়ীদের জন্য। ৩৪ বছরে এ পত্রিকা কী কী করেছে সে হিসেব আমার নিকট ততটা মূখ্য নয়, যতটা ফ্যাসিবাদের আস্ফালন হুংকার যখন দেশের আকাশে মেঘের ঘনঘটায় কালো ঝড়ে আচ্ছাদিত করে রেখেছিলো তখন এই পত্রিকা অনেক সাহসী কাজ করেছে, এটি আমার নিকট গুরুত্বপূর্ণ এবং এজন্যই অভিনন্দন ও শুভকামনা।
আসি সেই সময়ে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এর জন্মজয়ন্তীতে আমার একটা লিখা সিলেটের প্রায় বাকিসব পত্রিকা ছাপতে নানা গড়িমসি করছে অর্থাৎ না বলতে পারছে না কিন্তু বুঝিয়ে দিলো তারা অপারগ এবং একটি পত্রিকা বললো ছেপে দিব কিন্তু মহান স্বাধীনতার ঘোষক শব্দ ছাপানো যাবে না-আমি বললাম দরকার নেই লেখা ছাপার। অমন সময় ভাবছিলাম কী করি! জালালাবাদ কি ছাপবে! ইতস্তত বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে কল দিলাম তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মহোদয়কে। বললেন, ‘লেখা পাঠান দেখছি….’ সন্ধ্যার দিকে আমাকে কল দিয়ে বললেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিয়ে এ লেখা পুরোটা ছাপবো কথা দিলাম, কিন্তু দুর্যোগ কেটে গেলে মনে রাখিয়েন আমাদের কথা……..।’ আমি অবাক আনন্দে ৩০ মে লেখাটি পড়ে পণ করেছিলাম-সুদিন এলে এই পত্রিকা ভুলবো না, কিন্তু আমি কি মনের সঙ্গে প্রতারণা করছি! হয়তো অথবা হয়তো না! আজকের এই জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা দৈনিক জালালাবাদ।
কথা হচ্ছে, এ পত্রিকার রাজনৈতিক তকমা আছে, এখন কথা আরও আছে কোন্ পত্রিকায় সেটি নেই! এ দেশে রাজনৈতিক তকমা সর্বত্র। পত্রিকা সামাজিক সংগঠন ক্লাব বা ঘরের উনুনেও রাজনীতির লেলিহান দাবানল ছেয়ে গেছে যাচ্ছে এবং এটি রোধিবে সাধ্য কার! যদি বলি সাধ কি আছে কারও যে এটি বলা- ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড় দলের চেয়ে দেশ…..’ এখন কেউ বলতেই পারেন, ভাই আপনিতো আপনার আদর্শিক নেতার উদ্বৃতি তুলে ধরলেন! হ্যাঁ এজন্য তুলে ধরলাম, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ছাড়া শতভাগ বাংলাদেশপন্থী খুঁজে পাওয়া মুশকিল! তবে জীবনে রাজনীতির শেষ পর্যায়ে এসে বেগম খালেদা জিয়াও মতের উর্ধ্বে প্রায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন বলে অনেকেই মত দেন। এক্ষেত্রে শহীদ জিয়া ও মাওলানা ভাসানী অনন্য। ধান ভানতে শিবের গীত নয়, আমি জালালাবাদ পত্রিকার কথায় তাঁদের এনেছি এই কারণে যে, সঙ্কটকালীন সময়ে এই পত্রিকা তাঁদের কথা বলতে পেছপা হয়নি অথচ এই পত্রিকা আজ তকমার বাতাবরণ নিয়েও কিন্তু জ্বলজ্বল করছে বটে।
জালালাবাদের পাঠক হিসেবে আমার ধারণা হলো, এখানে দক্ষিণ এশিয়া তথা পাক ভারত এই উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। যার ফলে কখন কী হচ্ছে বা হতে পারে অথবা ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে ভবিষ্যৎ নিয়ে কলাম স্থান পায়, যে কারণে এই পত্রিকা হয়তো দু’শ তিনশো বছর পরে রেফারেন্স হয়ে আগামীর রাজনৈতিক সামাজিক এমনকি স্থানীয় বহু ঘটনার স্বাক্ষর হয়ে আলো ছড়াবে।
আমাকে কেউ কেউ দোষারোপ করেন আমি আবেগি, হুট করে নিজের ভালোমন্দ না দেখে মুখে যা আসে তা বলি। এজন্য শুভাকাঙ্খীরা আফসোস করেন এই বলে, ‘তাঁর আর ভালো হবে না-সে বলতে কালবিলম্ব করে না…..’ এরকম নানা অনুযোগ করেন। নিশ্চয়ই তাঁরা আমার ভালো চান না হলে কেন বলবেন! সেক্ষেত্রে আমার কথা স্পষ্ট-যা চোখের আড়াল সে আমি জানি না, কিন্তু মন যা সায় দেয় তা আমি বলবো এবং এই বলাটা ছাড়া আমার আর কী আছে!! তাই নিঃসঙ্কোচে বলি- সতেরো বছরের ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে এক জ্বলজ্বলে প্রিন্ট মিডিয়া ছিল দৈনিক জালালাবাদ।
মনে পড়ে শহীদ আবু তুরাব এ-ই ক্ষণে। সিলেটের একমাত্র শহীদ সাংবাদিক এই পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন তখন। তবে কি জালালাবাদ পত্রিকাকে নিয়তির স্বাক্ষর করতে বিধাতার ইশারা ছিলো! কে জানে! দৈনিক জালালাবাদ এখন গৌরবের ধন হয়ে গেলো- অহঙ্কার করে বলতেই পারে, শহীদ আবু তুরাব আমাদের ছিলেন। বাহ্ এই নিয়তি কোন সুদুরে লিখে রাখে কার গৌরব সে কেবল জানেন মহান রব আল্লাহ পাক। আল্লাহ পাক আবু তুরাবকে জান্নাত নসীব করুন আ-মিন।
মহামারী কোভিড-১৯ যখন সব থামিয়ে দেয়, পত্রিকার পাতা কমিয়ে দেয়, জীবনকে অসংলগ্ন করে তোলে তখনও জালালাবাদ থামেনি, ছেপেছে বহু কলাম ঐ দুই পাতার মধ্যে। কলাম যে সবসময় ছেপেছে তা নয় কিন্তু বিশেষ বিষয় ও গুরুত্বপূর্ণ কলামিস্ট ঠাঁই পেয়েছেন সেই সময়ে। আমি যখন বলতাম, লেখা একটু বড় দিব কি! সম্পাদক মহোদয় বলতেন, খসরু ভাই পাঠিয়ে দিন দেখছি। রাজনীতি ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম নিয়ে লেখার একটি শব্দও মুছে না দিয়ে যে পত্রিকাটি লেখা মুদ্রণে আমার বিপ্লবী মন রাঙিয়ে দিত সেই পত্রিকা দৈনিক জালালাবাদ।
সিলেটে বেশ কয়েকটি পত্রিকা আছে যারা নিজেদের মতো করে আলো ছড়িয়ে আছে। তাঁদের কাতারে আমার বিচারে জালালাবাদ এক দুই বলবো না, কিন্তু আকাশের নক্ষত্র যেমন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত তেমনি দৈনিক জালালাবাদ।
সমালোচনা না করে আমি ক্ষান্ত হবো না এটি সর্বজনবিদিত। তাই প্রথম কথা-রাজনৈতিক তকমা সরাতে চেষ্টা করতে হবে, ইতোমধ্যে বহু নতুন পত্রিকা কাগজের মান উন্নতি করে ঝকঝকে তকতকে ছাপায় বের হচ্ছে অথচ জালালাবাদ কোথায় যেনো ঠেকে আছে। এবং সাহিত্যে পাতা যেনো আছে নাইর মতো চলছে, যেটি নিঃসন্দেহে এই পত্রিকার সঙ্গে মানানসই নয়। সর্বোপরি সময়ের সঙ্গে মানিয়ে এবং পুরাতন গৌরবের ধন মননে নিয়ে আরও বেশী আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সংবাদ ঠাঁই দিতে হবে। মফস্বল বাদ দিতেই পারেন না কারণ ঐ মফস্বলে আমার হাছন, রাধারমণ, শাহ করিম, চৌধুরী গোলাম আকবর, সৈয়দ মুজতবা আলীসহ শত ফুল ফুটেছিলো। তাই এদিকে নজর দিলে জালালাবাদ নিজেই রঙিন হবে।
এমন হাজারো রঙের আলোকচক্র দৈনিক জালালাবাদকে আগামী শতকের দৈনিকে রূপান্তরিত করুক- এই আশাবাদ করে ৩৪তম জন্মবর্ষের নিরন্তর শুভেচ্ছা।
লেখক : কবি, আবৃত্তি শিল্পী ও প্রাবন্ধিক।






