শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে চাই প্রশিক্ষণ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ জুলাই ২০২৬, ৭:৪৭:০২ অপরাহ্ন
সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান:

সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, সিলেট।
যেকোনো জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে আর সেই শ্রেণিকক্ষের প্রাণ হলেন মহান শিক্ষক। শিক্ষাবিজ্ঞানের (Pedagogy) আধুনিক তত্ত্ব অনুযায়ী শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরী নয়, নয় নিছক জ্ঞান বিলানো
বরং একে বলা যায় একটি নিরন্তর পরিবর্তনশীল কাঠামোবদ্ধ সুবিন্যস্ত প্রক্রিয়া। আজকের জগত দ্রুত পরিবর্তনশীল। বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির জয়জয়কার। প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। শিক্ষা বিজ্ঞানের মূল দর্শন হচ্ছে শিক্ষাদানকে একটি বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক রূপ প্রদান করা। পশ্চিমা বিশ্বের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদগণ প্রশিক্ষণের গুরুত্বকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। জন ডিউই (John Dewey) এর মতে, “শিক্ষা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি প্রক্রিয়া।” এই প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে হলে শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত হতে হবে। পাউলো ফ্রেইরি (Paulo Freire) তিনি প্রথাগত ‘ব্যাংকিং মডেল’ শিক্ষার পরিবর্তে সংলাপধর্মী শিক্ষার কথা বলেছেন। শিক্ষকদের এই সংলাপ ও সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষ হতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। জঁ পিয়াজে (Jean Piaget) শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের স্তর অনুযায়ী পাঠদান নিশ্চিত করতে একজন শিক্ষককে অবশ্যই শিশুর মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণে ঋদ্ধ হতে হবে। এশীয় অঞ্চলে শিক্ষককে কেবল তথ্য প্রদানকারী হিসেবে নয়, বরং ‘গুরু’ বা ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে দেখা হয়। এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে (যেমন- চীন, ভারত, বাংলাদেশ) শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর মনোযোগ ধরে রাখা এবং বৈচিত্র্যময় শিখন চাহিদা মেটানোর জন্য বিশেষায়িত ‘Pedagogical Skills’ এর জ্ঞানের প্রয়োজন আছে। পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে শিক্ষকদের নিরন্তর ছাত্র থাকার ওপর জোর দেওয়া হয়। জাপানের ‘Lesson Study’ বা সিঙ্গাপুরের বাধ্যতামূলক ১০০ ঘণ্টার বার্ষিক প্রশিক্ষণ মডেল আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। রবীন্দ্রনাথের মতে, “এক শিখা যেমন অন্য শিখাকে জ্বালায়, তেমনি শিক্ষকের জ্ঞানতৃষ্ণা শিক্ষার্থীর মধ্যে সঞ্চারিত হতে হবে।” এই জ্ঞানতৃষ্ণা সজীব রাখার জন্য প্রশিক্ষণ আবশ্যক। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ২০২৩ সাল থেকে প্রবর্তিত নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম শিক্ষকদের চিরাচরিত ভূমিকাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ‘সহায়তাকারী’ (Facilitator) হিসেবে শিক্ষক নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকের ভূমিকা কেবল গৎবাঁধা লেকচার দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখতে,বুঝতে সহায়তা করা। এই রূপান্তরের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শিক্ষকদের ডিজিটাল টুলস, মাল্টিমিডিয়া এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম (যেমন: মুক্তপাঠ) ব্যবহারে দক্ষ হতে হচ্ছে। প্রযুক্তি ও এআই-এর সমন্বয়ে পাঠদান এখন সময়ের দাবি। প্রথাগত পরীক্ষার বদলে এখন ‘পারদর্শিতার নির্দেশক’ (PI) এর মাধ্যমে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ‘নৈপুণ্য’ অ্যাপের মতো আধুনিক টুলস পরিচালনা এবং গুণগত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে নিবিড় প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।শিক্ষকদের দক্ষতা কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বহুমুখী:
১। মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং: শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ নিরসনে শিক্ষকের সহমর্মী হওয়া জরুরি।
২। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা: বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রান্তিক শিশুদের মূলধারায় যুক্ত করার দক্ষতা।
৩। কর্মসহায়ক গবেষণা (Action Research): শ্রেণিকক্ষের বাস্তব সমস্যা সমাধানে শিক্ষকদের নিজস্ব গবেষণা।
৪। পেশাদারিত্ব ও নেতৃত্ব: নৈতিকতা, সময়ানুবর্তিতা এবং দলীয় কাজের মাধ্যমে নেতৃত্ব প্রদান।
উন্নত প্রশিক্ষণের পথে কিছু বাধা বিদ্যমান, যেমন—বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, পরিকাঠামোগত অভাব এবং পরিবর্তনের প্রতি রক্ষণশীল মানসিকতা। তবে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ, ইন-হাউস ট্রেনিং এবং পিয়ার লার্নিংয়ের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেবল একটি পেশাগত বাধ্যবাধকতা নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের দক্ষতা এবং প্রাচ্যের মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষকরা যদি নিজেদের প্রতিনিয়ত গড়ে তোলেন, তবেই ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এবং ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন সফল হবে। একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষকই পারেন একটি শ্রেণিকক্ষকে প্রাণবন্ত গবেষণাগারে পরিণত করতে এবং শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে। কথায় আছে একজন শিক্ষক ভালো তো দেশ ভালো আর দেশ ভালো তো আমি, আপনি ভালো, আমরা সবাই ভালো। একজন শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী যাত্রা। আজ যে শিক্ষক শিখতে থামবেন, কাল তিনি শেখানোর আগ্রহ ও অধিকার হারাবেন। তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করাই হোক আধুনিক শিক্ষকের মহান ব্রত।
লেখক: প্রশিক্ষক বিএড কোর্স, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।





