মহান জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৬:১৪ অপরাহ্ন
আজ মহান ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’। ছাত্র-জনতার রক্তে লেখা মুক্তির অবিনাশী দিন। প্রতি বছর ৫ আগস্ট ফিরে আসে ফ্যাসিবাদের পতন ও জনতার জয় নিয়ে। চব্বিশের এই দিনে ছাত্র-জনতার উত্তাল তরঙ্গের মুখে ধুলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিলো স্বৈরাচার আধিপত্যবাদীদের দীর্ঘ পনেরো বছরের শাসন ও শোষণ। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি তরুণ প্রজন্মের মাতৃভূমির জন্য বুক পেতে দেওয়ার গৌরবময় ইতিহাস। দেশ মাতৃকাকে শৃংখলমুক্ত করার রক্তঝরা এই দিনটি দেশব্যাপী জাতীয়ভাবে এমনকি বিশ^ব্যাপী, যেসব দেশ ও ভূখন্ডে বাংলাদেশীরা আছেন সেসব স্থানে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালিত হবে।
আধিপত্যবাদী ভারতের সামগ্রিক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতায় স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তার দলীয় দোসররা বাংলাদেশকে তাদের জমিদারীতে পরিণত করেছিলো। তাই কথায় কথায় শেখ হাসিনা বলতো, এটা আমার দেশ, আমার বাপের দেশ। আমি এখানে যা খুশী তাই করবো। আমি যা বলবো, তাই করতে হবে এদেশের মানুষকে। তার এসব কথাবার্তা জার শাসিত রাশিয়া ও রাজতন্ত্রী ফ্রান্সের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশ দু’টির মতো বাংলাদেশও দীর্ঘকাল পারিবারিক শাসনের শৃংখলে বন্দী ছিলো। এই দীর্ঘ শাসনের সুযোগ খুলে দিয়েছিলো শোষণের দুয়ার। দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী সরকার দেশে সৃষ্টি করেছিলো আইয়ামে জাহেলিয়াততুল্য পরিস্থিতি ও পরিবেশ। যেখানে ছিলো না সুশাসন ও ন্যায়বিচার। বরং অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন খুম গুম ছিলো দৈনন্দিন চিত্র। প্রতিবাদী মানুষকে চিরতরে স্তব্ধ করার জন্য তৈরী করা হয়েছিলো কুখ্যাত আয়নাঘর, যা হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের সাথে তুলনীয়। এই আয়নাঘরে বিরোধী মতাদর্শের কতো মানুষের জীবন ঝরে গেছে তার পূর্ণ হিসাব আজো মিলেনি। সামরিক বাহিনীর জেনারেল তারিক সিদ্দিকী ও জিয়াউল আহসানের মতো জল্লাদরা ছিলো এই আয়নাঘর ও খুন গুমের মূল কর্তা ব্যক্তি, যদিও শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এগুলো পরিচালিত হতো। এসবই জাতিসংঘের মতো বিশ^ সংস্থার তদন্তে দিবালোকের মতো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। আর জাতিসংঘের এই ফাইন্ডিংয়ের কারণে শেখ হাসিনা আজ বিশে^র প্রতিটি দেশে ‘খুনী শাসক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত। একমাত্র তার প্রভু ও আশ্রয়দাতা দেশ ভারত ছাড়া বিশে^র সকল দেশে সে অবাঞ্ছিত ও ঘৃণিত। শেখ হাসিনা শুধু নির্যাতন ও খুন গুম করেই ক্ষান্ত হয়নি, সে তার পরিবারের লোকজন, আত্মীয় স্বজন এবং দলীয় লোকজন নিয়ে এদেশের বিপুল অর্থ সম্পদ লুটপাট করেছে। শে^তপত্র অনুযায়ী এই স্বৈরশাসক তার দেড় দশকের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ৭ লক্ষ কোটি টাকারও বেশী অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করেছে। তার গোটা শাসনামলে যেসব উন্নয়ন কাজের দাবি করে সেও তার দলের লোকজন, সেইসব কাজ বা প্রকল্পগুলোর পেছনেও ছিলো মারাত্মক দুরভিসন্ধী ও অসৎ উদ্দেশ্য। সে এমন সব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছিলো, যেগুলো থেকে সহজে অর্থ আত্মসাত করা যায়। এই স্বৈরশাসক কখনো এমন কোন মেগা প্রকল্প গ্রহণ বা বাস্তবায়ন করেনি, যা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা দরকার। সে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সহজে ঋন প্রদানের কোন ব্যবস্থা না করে তার পারিবারিক ও দলীয় অলিগার্ক ব্যবসায়ীদের ব্যাংক লোন দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছিলো। দেশে বেকারত্ব দুরীকরণে একটিও মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেনি সে। দেশে কলকারখানা স্থাপনের পরিবর্তে চালু কল কারখানা বন্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলো সে, যাতে এদেশের জনগণ তার প্রভু দেশ ভারতের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়। আর এসবের পুরস্কার ও সে পেয়েছে প্রভু দেশ ভারতের কাছ থেকে। এদেশের জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ থেকে পালিয়ে যাবার পর এই ভারতেই আশ্রয় পেয়েছে সে। এখন এই ভারতে বসে দেশটির পৃষ্ঠপোষকতা ও চক্রান্তে আবার নতুন করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে সে। এই ভারতের চক্রান্তেই তার পিতা শেখ মুজিব দেশকে গোলাম বানিয়েছিলেন ভারতের। আর তারই কন্যা স্বৈরশাসক হাসিনা এদেশের ক্ষমতা কুক্ষীগত করে বাংলাদেশকে পুনরায় আধিপত্যবাদী ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তার দেড় দশকের শাসনামলে। কিন্তু জুলাই ও আগস্টের রক্তক্ষয়ী মহাবিপ্লব তার এই চক্রান্ত চিরতরে নস্যাৎ করে দিয়েছে। তাকে বিতাড়িত করে এদেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছে। প্রণয়ন করেছে জাতির মুক্তির জুলাই সনদ। ব্রিটিশ ম্যাগনাকার্টার মতোই গুরুত্বপূর্ণ এই সনদ। কারণ এতে এদেশের জনগণের মুক্তির দিক নির্দেশনা অংকিত। ফ্যাসিবাদের চিরবিদায় বিধৃত। এই জুলাই সনদ পূর্ণ বাস্তবায়ন আজ সময়ের দাবি, যার সাথে আপস করার কোন সুযোগ নেই। যারাই এই সনদের সাথে বেঈমানী করবে, তাদেরও পরিণতি হবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতোই। চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর যে ‘নতুন বাংলাদেশ’ অর্জিত হয়ন, তার মূল স্পিরিট নিহিত এই জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ এর মাঝে। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণে রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত এবং গণভোটে পাশকৃত এই ঐতিহাসিক দলিল দ্রুততম সময়ে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। আর এরই মাঝে নিহিত জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত সাফল্য ও সার্থকতা।






