জনবল-যন্ত্রপাতিতে আটকা ওসমানীর ক্যান্সার ইউনিট
প্রকাশিত হয়েছে : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:৪৩:৩০ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ শেষ হলেও লিফট এবং আনুষাঙ্গিক কিছু কাজ বাকি থাকায় চালু করা যাচ্ছে না শতকোটি টাকা ব্যয়ে ওসমানী হাসপাতালের ক্যান্সার ইউনিট। এছাড়া এখনো জনবল নিয়োগের কাঠামোও অনুমেদান হয়নি। আমদানি করা হয়নি হাসপাতালের যন্ত্রপাতিও। ফলে শিগগির ওসমানীর ক্যান্সার ইউনিট চালু নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তবে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার ইউনিট আগামী অর্থবছরের মধ্যেই চালু করার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জাতীয় সংসদে ময়মনসিংহ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালমান ওমরের একটি প্রশ্নের জবাবে ওসমানীসহ ৮ বিভাগের ক্যান্সার হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনার কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এক বছরের মধ্যে চালুর ঘোষণা দিলেও সেটা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ এখনো জনবল কাঠামো অনুমোদন হয়নি। বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানি করাও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে হাসপাতালটি চালু নিয়ে সংশং রয়েছে।
সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালমান ওমর সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান, বিভাগীয় শহরগুলোতে ক্যান্সার হাসপাতালের কাজ চলমান আছে, এই হাসপাতালগুলোতে কাজ সম্পন্ন হতে কত সময় লাগবে এবং রোগীরা এই বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে কবে নাগাদ সেবা পাবে? জবাবে প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, এই ৮টি বিভাগীয় ক্যান্সার হাসপাতালের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা চলছে। বিশেষজ্ঞ জনবল পদায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী অর্থবছরের মধ্যেই এই ক্যান্সার হাসপাতালগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।
তথ্য মতে, দেশের ৮ বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ হাসপাতালের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। গত জুনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় প্রকল্পের নির্মাণ কাজের ‘অগ্রগতি কম’ বলে মন্তব্য করা হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৮ বিভাগে শুরু হওয়া ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের কাজ ৮ বছরেও শেষ হয়নি। ৪ বার মেয়াদ ও দুইবার ব্যয় বৃদ্ধির পরও নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি একটি ভবনও। তবে এই কচ্ছপগতির নির্মাণপ্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতায় খরচ হয়ে গেছে প্রায় একশ কোটি টাকা।
তবে এরই মধ্যে নতুন করে আবারও সংশোধনী আনা হচ্ছে প্রকল্পটিতে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ইতেমাধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে এর প্রাক্কলিত ব্যয়ও বাড়বে।
সশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘আটটি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯ সালের অক্টোবরে ওসমানী হাসপাতালের ক্যান্সার ইউনিটের ভবনের কাজটি শুরু হয়। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ১৭ তলা ভিত্তির ওপর ১৫ তলা বিশিষ্ট ভবনটি নির্মিত হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত এ প্রকল্পের মূল বাজেট নির্ধারণ করা হয় ৮৯ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪০৬ টাকা। ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট চুক্তির পর ২৪ মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে ভবনের ভৌত কাঠামো ও ফিনিশিংয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ভবনটিতে দুটি বেজমেন্টসহ সিভিল, স্যানিটারি ও অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
হাসপাতালে জটিল ক্যান্সার রোগীদের জন্য রেডিওথেরাপি, ব্র্যাকিথেরাপি, ডে-কেয়ার কেমোথেরাপি ওয়ার্ড এবং পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক আধুনিক ওয়ার্ড থাকার কথা। পাশাপাশি সার্জিক্যাল ব্লক, নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, নেফ্রোলজি ইউনিট, সর্বাধুনিক ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং ডে-কেয়ার কার্ডিয়াক সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার সমন্বয়হীনতায় হাসপাতালটি আটকে আছে। জানা গেছে, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য জনবল কাঠামো এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান হাতিয়ার লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর ও ব্র্যাকিথেরাপি মেশিনসহ ডায়ালাইসিস সরঞ্জাম কেনার বৈশ্বিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থমকে রয়েছে।
এদিকে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক ক্যান্সার এবং কিডনি রোগী প্রতিদিন ওসমানী হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে সিটের জন্য হাহাকার করছেন। যাদের সামর্থ্য নেই তারা প্রয়োজনীয় রেডিওথেরাপি বা ডায়ালাইসিস সেবা না পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর বিত্তবানদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চড়া মূল্যে ছুটতে হচ্ছে ঢাকা কিংবা দেশের বাইরে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার মনসুর রহমান দাবি করেন তাদের ভবন নির্মাণের কাজ শেষ। তিনি বলেন, ‘এক বছর ধরে ভবনটি হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষায় রয়েছি। ভবনের আসবাব ও লিফট স্থাপন পিডি ও গণপূর্তেও কাজ। এখন ভবনটি বুঝিয়ে দিতে পারলেই আমাদের কাজ শেষ।
প্রকল্প তদারকের দায়িত্বে সিলেট গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, ভবন নির্মাণ-সংক্রান্ত ৯৮ ভাগ কাজ শেষ। আমাদের কেবল লিফট ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজ বাকি রয়েছে। একাধিকবার লিফট কেনার দরপত্র আহ্বান করলেও ২০১৮ সালের রেটে কোনো প্রতিষ্ঠান সাপ্লাই দিতে পারছে না। এর জন্য পুনরায় দাম নির্ধারণ করছে মন্ত্রণালয়। সেটা কবে হবে তা নিশ্চিত নই। ডলারের দর বৃদ্ধির ফলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রকল্প পরিচালক ডা. তৌফিক হাসান ফিরোজ জানান, মূলত ডলারের দর বৃদ্ধি ও সরঞ্জামের চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। মূল খরচের হিসাব যখন করা হয়েছিল, তখন ডলারের দাম ছিল প্রায় ১০৯ টাকা। কিন্তু পরে সরকারি রেট বেড়ে ১২৩ টাকা হওয়ায় কেনাকাটার খরচ বেড়ে গেছে। নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদিত হলেই যন্ত্রপাতি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তিনি বলেন, এ প্রকল্পে কেবল সিলেট নয়, সারা দেশে আটটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সিলেট ইউনিট অবকাঠামো দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। আমাদের সবকটা প্রকল্প মাথায় নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
ডা. তৌফিক হাসান ফিরোজ বলেন, আটটি কেন্দ্রের জন্য ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য কর্মী মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার পদে জনবল সৃষ্টির একটি নতুন প্রস্তাব সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুততম সময়ে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। হাসপাতালটি চালু করতে আরো দুই বছর লাগতে পারে। কারণ এর সঙ্গে বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আমদানির বিষয় জড়িত রয়েছে।






