বাংলাদেশের সামনে ৬ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ৭:১৯:০৭ অপরাহ্ন
জালালাবাদ ডেস্ক : স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ কার্যকর হবে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে এই সময় বাড়ানো হয়েছে।
তবে বাড়তি তিন বছর পেলেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ দূর হয়ে যাবে না। বরং এই সময়ের মধ্যে রফতানি সক্ষমতা বাড়ানো, নতুন বাজার তৈরি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার মতো ৬টি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এগিয়ে নিতে হবে। একইসঙ্গে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রস্তুতিও নিতে হবে।
রফতানি সুবিধা কমলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা : বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো রফতানি খাতের সক্ষমতা ধরে রাখা। দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পেয়ে থাকে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার কিছু পরিবর্তন হতে পারে, যা রফতানিকারকদের ব্যয় ও প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন বাজার ও বিনিয়োগ বাড়ানো : রফতানি বহুমুখীকরণের জন্য নতুন বাজার খুঁজে বের করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা বাংলাদেশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভর করলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন কিংবা ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকা কঠিন।
ব্যাংক খাত ও আর্থিক দুর্বলতা কাটানো : অর্থনীতির টেকসই রূপান্তরের জন্য ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানোও জরুরি। খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি, ঋণ আদায়ে দুর্বলতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করতে পারে।
রাজস্ব বাড়ানো ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ : বাংলাদেশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। উন্নয়ন অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিল্পায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু করের আওতা সীমিত থাকা, কর ফাঁকি এবং কর প্রশাসনের দুর্বলতা সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।
কর্মসংস্থান ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি : এলডিসি উত্তরণ টেকসই করতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের জন্য মানসম্মত চাকরি সৃষ্টি, নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। শুধু শ্রমনির্ভর উৎপাদন দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা কঠিন। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সুশাসন ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা : ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে সুশাসন এবং নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন নীতির পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একইসঙ্গে বলা হয়েছে, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।
তাই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে বাড়তি সময়ের সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রথমেই একটি বাস্তবসম্মত ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। কোন সংস্কার কখন বাস্তবায়ন করা হবে, কোন প্রতিষ্ঠান এর দায়িত্বে থাকবে এবং অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ও অবকাঠামো সুবিধার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।






