শুরু হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ, শঙ্কায় কৃষক
প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ৭:১৮:২৯ অপরাহ্ন
তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, জামালগঞ্জ:
সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের কৃষকদের দুশ্চিন্তা যেন পিছু ছাড়ছেনা। বছরে একটিমাত্র বোরো ফসলকে ঘিরেই হাওরপারের কৃষকদের যত স্বপ্ন। পৌষে বুনা ধানের চাড়ায় বৈশাখে সোনালী ধানের স্বপ্নে বিভোর থাকেন কৃষকরা। এই ফসল রক্ষায় চলতি বছর সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জসহ জেলার ১২ টি উপজেলায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অধীনে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজ উদ্বোধন হয় গত ১৫ ডিসেম্বর। উদ্বোধনের ২৬ দিন পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ বাঁধের কাজ এখনো শুরুই হয়নি।
হাওর এলাকায় বছরে একটিমাত্র বোরো ফসল রক্ষার অন্যতম ভরসা ‘হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ। এই বাঁধ নির্মাণে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। জেলার বেশিরভাগ হাওরে এই বাঁধের কাজ এখনো আশানুরূপ হয়নি। কিছু কাজ চলমান থাকলেও গুণগতমান কি তা নিয়ে সুধি সমাজে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও আবার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিও (পিআইসি) কাদের কে দেয়া হচ্ছে বা হয়েছে, তা উপজেলা মনিটরিং কমিটির অনেকেই জানেননি। অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট এলাকার পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) তাদের পছন্দের লোকদের দিয়ে খুব কৌশলে কাজ করাচ্ছে। অনেক অক্ষত বাঁধে বরাদ্দ সেই আগের মতোই দেয়া হয়েছে।
গত শনিবার-রোববার ২ দিন জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনা হাওর-হালির হাওর, ধর্মপাশা উপজেলার ধানকুনিয়া-ধারাম হাওর, তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরের একাংশ হাওরের বিভিন্ন বাঁধ ঘুরে দেখা গেছে অনেক বাঁধই অক্ষত রয়েছে। শুধুমাত্র বেশ কিছু ক্লোজার ভাঙ্গা আবার কিছু ক্লোজারে গত বছরের কাজের প্রায় অর্ধেকের মতো মাটি ভরাট কাজ রয়ে গেছে। তবে বাঁধের অনেকাংশেই উঁচু ও মেরামতের জন্য উপযোগী। হাওরের কোন কোন ক্লোজার দিয়ে পানি নামলেও প্রকল্প বাঁধের সিংহভাগ অংশে কাজ করতে তেমন কোন বাধা বা সমস্যা দেখা যায়নি। কিন্তু বাস্তব চিত্রে হাওরের প্রায় অনেক প্রকল্প এলাকায় এখনো কোন কাজ শুরুই হয়নি। যা প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকরা চরম সংক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেন।
জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের মেরামত কাজের জন্য পাউবো মোট ৪১ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়। এর মধ্যে শনিবার পর্যন্ত মাত্র ১৬টি প্রকল্পে মাটি কাটার কাজ শুরু হয়েছে বলে পাউবোর উপজেলা অফিস থেকে জানা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী গত বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের প্রকল্প স্থান নির্ধারণ, প্রাক্কলন তৈরি, জরিপ কাজ, গণশুনানি, পিআইসি গঠনসহ যাবতীয় কাজ শেষ করার পর ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরু করে তা ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা। কিন্তু কাজ শুরুর নির্ধারিত সময়ের ২৬দিন পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ বাঁধে এখনোও মাটি কাটার কাজ শুরুই হয়নি। যথাসময়ে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শুরু না করায় আগাম বন্যায় হাওরে থাকা বছরের একমাত্র বোরো ফসলহানীর আশংকা করছেন কৃষকরা।
এলাকাবাসীসহ উপজেলা কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ কমিটির একাধিক সদস্যের অভিযোগ, হাওরের অধিকাংশ বাঁধ অক্ষত থাকলেও এবার কাজের বরাদ্দ কমেনি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিগুলো (পিআইসি) সংশ্লিষ্ট বাঁধের নিকটবর্তী গ্রামের কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে করার কথা থাকলেও এবার পিআইসি করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট বাঁধের ২ থেকে ৬-৭ কিলোমিটার দূরের গ্রামের তাদেরই পছন্দের লোকজন দিয়ে।
এছাড়াও উপজেলার পাকনা হাওরের বগলাখালী নামক ক্লোজারে প্রতি বছরই ৪০ ও ৪১ নাম্বার এই ২টি পিআইসি গঠন করে প্রকল্পের কাজ করা হয়। এ দুটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয় প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এবার ওই দুটি প্রকল্পের অর্ধেক বাঁধ অক্ষত থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে গত বছরের সমপরিমাণ এবং পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলীর পছন্দের লোকজনদের। এই প্রকল্পের সাথে লাগা গ্রামের (আলীপুর) কৃষকরা আবেদন করে প্রাথমিক তালিকাভুক্তি হলেও অদৃশ্য কারণে তাদের বাতিল করে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরের লোকজন দিয়ে কাজ করানোর লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। জামালগঞ্জ উপজেলার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজে ৪১টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭ কোটি ৬৪লাখ ৬১ হাজার টাকা।
সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলার ৫৩ টি হাওরে ৭০২টি প্রকল্প (পিআইসি) কাজ করবে। বরাদ্দের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। ৫৮৫ কিলোমিটার প্রাক্কলিত বাঁধের মধ্যে ১০৪টি জায়গায় ক্লোজার (ভাঙা) আছে। বরাদ্দেরও কোন কমতি নেই।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, পাউবো গত ১৫ ডিসেম্বর হাওরে লোক দেখানো বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে, যার প্রমাণ এখনো জেলার অধিকাংশ বাঁধে কাজই শুরু হয়নি। গত বছরের অক্ষত বাঁধে বরাদ্দ ঠিকই রয়েছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাউবোর বিভিন্ন অনিয়মের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা প্রেস কনফারেন্স করেছি। ভবিষ্যতে কৃষকদের পক্ষে অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় সব আন্দোলন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, আমি এখন হাওরের বিভিন্ন বাঁধ পরিদর্শনে আছি। বিভিন্ন হাওরের পানি নামতে বিলম্ব হচ্ছে, সে কারণে বাঁধ নির্মাণ কাজ কিছুটা দেরি হচ্ছে। তবে আশা করছি সময় মতোই কাজ শেষ হবে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।





