আয়াতুল্লাহ খামেনি : ইরানের শাসন ও প্রতিরোধের অক্ষ
প্রকাশিত হয়েছে : ০১ মার্চ ২০২৬, ৯:৪৩:৪৭ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টার : ১৯৩৯ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর বাবা একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন। ১৯৬২ সালে খামেনি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশটির উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন। ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামী বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) গড়ে তুলতে আলী খামেনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ (ধর্মীয় নেতাদের একটি পর্ষদ) আলী খামেনিকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করেন; যদিও তাঁকে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দিতে সংবিধান সংশোধন করার প্রয়োজন পড়ে।
দেশের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের রাজনীতি ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। তাঁর শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় দেখা দেওয়া নানা চ্যালেঞ্জ তিনি কঠোর হাতে দমন করেছেন।
দেশের বাইরের বিষয়েও নিয়মিতভাবে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। নিজ দেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র ইসরায়েলসহ অন্য পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে তিনি কখনো মাথানত করেননি।
আলী খামেনির সময় ইরানের সাতজন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর ছয় সন্তান রয়েছে।
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন সেই আদর্শগত শক্তি, যিনি ইরানে পাহলভি রাজতন্ত্র অবসানের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন সেই নেতা, যিনি ইরানের সামরিক ও আধা সামরিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালীরূপে গড়ে তুলেছিলেন। এ ব্যবস্থা শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে ক্ষান্ত হননি, বরং দেশের সীমার বাইরে গিয়েও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। আজকের ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা তিনিই গড়ে তুলেছিলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে দেশটির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
দীর্ঘ যুদ্ধ, সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার কারণে ইরানিদের ভেতর একধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আলী খামেনির অবিশ্বাস আরও গভীর হয় বলে মত বিশ্লেষকদের।
আর এই মনোভাবই তাঁর দশকব্যাপী শাসনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। তাঁর এই ধারণাকে দৃঢ় করেছিল যে ইরানকে সব সময় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় থাকতে হবে।
এই মনোভাব থেকেই তিনি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীকে (আইআরজিসি) আধা সামরিক বাহিনী থেকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। পরে এই বাহিনী পুরো অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা গ্রহণ করে।
খামেনি ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখেও স্বনির্ভরতা বাড়ানো যায়। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে গভীরভাবে সন্দিহান থাকতেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন :১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর বাবা একজন খ্যাতনামা মুসলিম নেতা ছিলেন। তিনি (বাবা) পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাকের আজারবাইজানি জাতিসত্তার ছিলেন।
আজারবাইজানি পরিবারটি প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ইরানের তাবরিজে বসবাস শুরু করেছিল, পরে মাশহাদে চলে আসে। শহরটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের পছন্দের স্থান। সেখানে আলী খামেনির বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের প্রধান ছিলেন।
আলী খামেনির মায়ের নাম খাদিজা মিরদামাদি। খামেনি নিজের মাকে পবিত্র কোরআন ও অন্যান্য বইয়ের একজন একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
খাদিজা মিরদামাদি তাঁর সন্তানের মধ্যে সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা জন্মিয়েছিলেন। পাহলভি রাজবংশের শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আন্দোলনে যোগ দেওয়াতেও মায়ের সমর্থন ছিল।
চার বছর বয়সে আলী খামেনি লেখাপড়া শুরু করেন। তিনি পবিত্র কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং মাশহাদের প্রথম ইসলামি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি হাইস্কুল শেষ করেননি; এর পরিবর্তে ধর্মতাত্ত্বিক স্কুলে ভর্তি হন এবং সে সময়ের খ্যাতনামা ইসলামি পণ্ডিতদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে তাঁর বাবা এবং শেখ হাসেম গাজভিনিও ছিলেন।
পরবর্তী বছরগুলোয় আলী খামেনি নাজাফ ও কোমের আরও খ্যাতনামা শিয়া উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলোয় লেখাপড়া চালিয়ে যান।
সর্বোচ্চ নেতা :
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব সফল হয়। ইরানে পাহলভি রাজবংশের শাসনের অবসান হয়। নতুন শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় চলে আসেন আলী খামেনি।
আলী খামেনি ১৯৮০ সালে অল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সূচনার পর তিনি ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৮১ সালটি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেবার অল্পের জন্য তিনি গুপ্তহত্যার চেষ্টা থেকে প্রাণে রক্ষা পান। তবে তাঁর ডান হাতটি অকেজো হয়ে যায়। ওই বছরই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনিই ইরানের প্রথম ধর্মীয় নেতা, যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ইসলামি বিপ্লবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
খোমেনি মৃত্যুর আগেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বহু বছর আগে থেকে নির্ধারিত আয়াতুল্লাহ হোসেইন আলী মন্তাজেরিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আলী মন্তাজেরি ১৯৮৮ সালে বন্দীদের গণমৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন।
পরে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত একটি পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে।
প্রতীকী নয়, সত্যিকারের নেতা ছিলেন খামেনি
দায়িত্ব গ্রহণ করেই আলী খামেনি দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। খামেনি যখন ক্ষমতায় আসেন, ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এ যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়।
ইরানের সেনা ও সাধারণ মানুষের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল ইরাক। এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিশ্ব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি বলে মনে করা হয়। ফলে এ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইরানের ক্ষোভ উসকে দিয়েছিল।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় খামেনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সে সময় তিনি প্রায়ই যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে যেতেন। সেখান থেকেই তিনি আইআরজিসি আনুগত্য অর্জন করেন এবং যুদ্ধের বাস্তবতা সরাসরি উপলব্ধি করেন।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তিনি সামরিক এবং আধা সামরিক ব্যবস্থাকে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন, যেন দেশের বিরুদ্ধে অবিরাম আক্রমণ মোকাবিলা করা যায় এবং ধারাবাহিক প্রতিরোধ নিশ্চিত হয়।




