বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ১০ হাজার জনবল নিয়োগ দেয় এস আলম
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ মে ২০২৬, ৮:৩৩:২০ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী ব্যাংক দখলের পর ৭ বছরে কোনো বিজ্ঝঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ১০ হাজার জনবল নিয়োগ দেয় বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ| যা দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে|
বাংলাদেশ ব্যাংক ও চারটি অডিট প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে| এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় ˆদনিকে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়| এই প্রক্রিয়াকে ˆবধতা দিতে ব্যাংকের নিয়োগ নীতিমালায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছিল|
এস আলম গ্রুপ যখন নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন ব্যাংকটির জনবল ছিল ১৩ হাজার ৫১৫ জন| সাত বছরে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৭০৬ জনে| এই সময়ে প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তা অবসরে গেলেও মোট নিয়োগ দেওয়া হয় ১২ হাজার ৩৮৬ জনকে| এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়োগ হয়েছে কোনো ধরনের পাবলিক বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই|
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো আঞ্চলিক ˆবষম্য| অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোট নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ১০৪ জনই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা| এর মধ্যে শুধু পটিয়া উপজেলারই রয়েছেন ৫ হাজার ১৪৮ জন|
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৭ সালে চট্টগ্রামে ব্যাংকটির জনবল ছিল ৮১১ জন| ২০২৪ সাল নাগাদ সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৫৮ জনে—প্রায় ৮৭০ শতাংশ বৃদ্ধি| অন্যদিকে পটিয়ায় জনবল মাত্র ৪২ জন থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৩৩১ জনে পৌঁছেছে—যা ১০ হাজার শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি|
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে| ২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচে কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ৮৪০টি সিভি সংগ্রহ করা হয়| লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৭৬৩ জন, যেখানে পাশ ন¤^র ছিল ৫০ শতাংশ| কিন্তু মাত্র ৩৬ জন এই মানদণ্ড পূরণ করেন| এরপর মানদণ্ড শিথিল করে মাত্র ২০ শতাংশ ন¤^র পাওয়া ৫৫২ জনকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়| এমনকি ১২ জনকে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়| এই ব্যাচের প্রার্থীদের ১০০ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের ছিলেন|
২০২১ সালের ২৫তম ব্যাচের ক্ষেত্রে অডিট প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রামের ১১৭ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষার ন¤^র ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়| ফলে চূড়ান্তভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৫০ জনের মধ্যে ১১০ জনই চট্টগ্রামের—অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ|
একইভাবে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (জেনারেল) ও (ক্যাশ) পদেও প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নিয়োগ দেওয়া হয়| ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টিএও (জেনারেল) পদে ২ হাজার ২৩২ জন ও টিএও (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৮২৮ জন নিয়োগ পান—যাদের অধিকাংশ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নির্বাচিত| অডিট কর্মকর্তারা বলছেন, এই ধরনের নিয়োগে মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়ে|
এছাড়া ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠান—যেমন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে ৪৩৯ জনকে নিয়ে আসা হয়| এর মধ্যে ১৯৩ জন নিয়োগ পান কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই|
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এ ধরনের নিয়োগের ফলে ব্যাংকের আন্তঃজেলা ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রার্থীরা কার্যত প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছেন| ইসলামি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসিম বলেন, তদন্তে এস আলম আমলের নিয়োগ প্রক্রিয়ার গুরুতর ত্রুটিগুলো বেরিয়ে এসেছে| তিনি বলেন, ওই সময়ে কোনো বিজ্ঞপ্তি, লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে|






