অবশেষে কওমি মাদরাসার চামড়া সংগ্রহের সিদ্ধান্ত
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ মে ২০২৬, ২:১৯:০৭ অপরাহ্ন
# কাটছে কি চামড়ার সংকট?

স্টাফ রিপোর্টার : কোরবানির চামড়া সংগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সিলেটের কওমি মাদরাসাগুলো। এতে চামড়া সংগ্রহে বড় ধরণের সংকট থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার বিকালে সিলেটের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কওমি মাদরাসা ভিত্তিক সংগঠন ‘কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’।
এ বিষয়ে আজ মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানাবেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
‘কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’ এর সদস্য সচিব মাওলানা মুশতাক আহমদ খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জেলা প্রশাসকের আশ^াসে আমরা চামড়া সংগ্রহ না করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছি। তবে ইতোমধ্যে ঈদের বন্ধে অনেক মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যাওয়ায় জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা নগরবাসীকে অনুরোধ করবো তারা যেন দানের চামড়া নিকটবর্তী মাদরাসায় পৌঁছে দেন। আর যেসব মাদরাসার আবাসিকে শিক্ষার্থীরা রয়েছেন তারা ঈদের দিন চামড়া সংগ্রহ করবেন।
জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চামড়া একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। জেলা প্রশাসক আমাদের এ বিষয়টি অনেক আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। তিনি আমাদের আশ^াস দিয়েছেন সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া বিক্রির ব্যবস্থা করবেন। এছাড়া, সংগৃহিত কাঁচা চামড়া পরিবহনে সহযোগিতা ও চামড়া প্রক্রিয়ায় দক্ষ লেবার দিবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোরবানির চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। আমরা চাই না আমাদের এ শিল্প কোনো সংকটে পড়ুক।’
সরকারের পক্ষ থেকে সিলেট জেলায় প্রায় আড়াইশ মন লবন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যেগুলো চামড়া ব্যবসায়ী ও চামড়া সংগ্রহের কাজে নিয়োজিতদের বিনামূল্যে বিতরণ করা হবে।
গত রবিবার থেকে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা যে যার বাড়িতে চলে গেছেন। প্রতিবছর সিলেটের লক্ষাধিক কোরবানি করা হয় এবং কোরবানির চামড়ার বড় অংশই সংগ্রহের কাজ করে কওমি মাদরাসাগুলো।
এদিকে, গত ১১ মে দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে এই ‘নীরব বিদ্রোহের’ ঘোষণা দেন দেশের শীর্ষ কওমি মাদরাসা ভিত্তিক সংগঠন ‘কওমি মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ’।
তারা কোরবানির চামড়া সংগ্রহ বর্জনের ডাক দিয়ে জানান, বছরজুড়ে সর্বসাধারণের দান, মৌসুমি চাঁদা, কোরবানির পশুর চামড়া কওমি মাদরাসা পরিচালনায় আয়ের অন্যতম উৎস। কিন্তু বিগত সরকার ২০১৩ সালে কওমি মাদরাসার এই অন্যতম আয়ের উৎস বন্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ওই সরকারের অসৎ উদ্দেশ্যে ক্রমান্বয়ে দেশের রপ্তানি শিল্পের অন্যতম এই পণ্য দেশের বাজারে দরপতনের শিকার হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কোরবানির চামড়া প্রায় মূল্যহীন পণ্যে পরিণত হয়। বর্তমান সরকারের উচিত ছিল চামড়া শিল্পের দেশীয় বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ব্যবসায়ীদের পাওনা টাকার একাংশ উদ্ধার আশ^াসে কিছুটা স্বস্তিতে সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ীরাও। সিলেটের ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩ থেকে সাড়ে তিন কোটি বকেয়া টাকা এখনো অপরিশোধিত রয়েছে ট্যানারি মালিক ও কমিশন এজেন্টদের কাছে। তবে চলতি বছরের (অর্থাৎ গেল ঈদ উল আদ্হা থেকে এ বছরের ঈদ উল আদ্হা পর্যন্ত) যে টাকা বকেয়া ছিল তার একাংশ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ীরা।
শাহজালাল (রহ.) চামড়া সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘চলতি বছরে প্রায় ১ কোটি টাকার মতো বকেয়া ছিল ঢাকার কমিশন এজেন্ট ও ট্যানারি মালিকদের কাছে। যার মধ্যে কাউকে ৫০ শতাংশ কাউকে ৬০ শতাংশ টাকা দেওয়া হচ্ছে। এখনো অনেক ব্যবসায়ী ঢাকায় আছেন। চলতি বছরের টাকা ছাড়াও তাদের কাছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। আমরা আগেই বলেছি বকেয়া টাকা পেলে ব্যবসা করতে পারব, অন্যথায় নয়।’
এতো টাকা কিভাবে বকেয়া হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ শিল্পটা ভাই কুমিরের পেটে চলে গেছে। আমাদের এখানে বড় সমস্যা যেটা মধ্যসত্বভোগী আরতদারেরা। যারা কমিশন এজেন্ট হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ করে তা ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করেন। তাদের গোডাউন আছেন জনবল আছে তারা নিজস্ব ব্যবস্থপনায় ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে দামদর নির্ধারণ করে আমাদের জানান। এরজন্য চামড়া প্রতি তারা একশ’ টাকা পর্যন্ত কমিশন নিয়ে থাকেন। তারাই পর্যায়ক্রমে বিক্রিত চামড়ার টাকা আদায় করে দেন। তাদের কাছেই মূলত আমাদের টাকাগুলো আটকে থাকে। তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন ট্যানারি মালিকরা টাকা দেয়নি। আর ট্যানারি মালিকরা বলেন তারা সব টাকা পরিশোধ করে দিয়েছেন। এসব সিন্ডিকেটের কাছে আমরা জিম্মি।
তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লোকেরাই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে এ শিল্পটাকে একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বিগত দিনে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে এ শিল্পের স্বর্ণযুগ ছিল। তাই আমরা আশাবাদী সিন্ডিকেট দমন করে বর্তমান সরকার এ শিল্প রক্ষায় কাজ করবেন।’
শাহজালাল (রহ.) চামড়া সমিতির লিয়াকত আলী বলেন, ‘বকেয়া টাকা উদ্ধারে আমি বর্তমানে ঢাকা আছি। টাকা পেলে ব্যবসা করবো। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়ায় আমাদের রানিং (চলতি বছরের) টাকার একাংশ পাওয়া যাবে। তবে পুরো টাকা উদ্ধারে প্রশাসনের শক্ত ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘আমরা কওমি মাদরাসাগুলোর সঙ্গে আলাপ করেছি। এখন ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসবো। আগামীকাল (মঙ্গলবার) সকাল ১১ টায় এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবো।’




