কোরবানি: আত্মার আহ্বান
প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ মে ২০২৬, ১২:২২:৪৪ অপরাহ্ন
‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’- এটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কোরবানি’ কবিতার একটি অমর পংক্তি। এই পংক্তির মধ্য দিয়ে কবি এক গভীর সত্য উন্মোচনের প্রয়াস পেয়েছেন। সত্যটি হচ্ছে, কোরবানির ঈদের পশু কোরবানির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা পালনের চেয়ে মনের ভেতরের ‘পশুত্ব’ বা অহংকারকে কোরবানি দেওয়া। কবি বলতে চেয়েছেন, বাইরে থেকে রক্তপাত মনে হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হলো সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকা বা সত্যাগ্রহ। দীর্ঘ বছর ঘুরে আবার আমাদের দুয়ারে হাজির পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহা বলতেই কোরবানির বিষয়টি চলে আসে। মনে অনুরণিত হয় একটি কথা ঃ ‘বিশ^জুড়ে আজ একই আহবান, একই বানী/কোরবানি ভাই কোরবানি’। এ ডাক শুধু কণ্ঠের নয়, এ আহবান আত্মার। আজকের সমাজে ত্যাগের এই শিক্ষা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশী প্রাসঙ্গিক। কারণ চারদিকে ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ, ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিতা আর বৈষম্যের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তাই কোরবানির পশুর রক্ত নয়, আসল কোরবানি হলো লোভ, হিংসা, মিথ্যা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, নিজেদের ভেতরের পশুত্বকে জবাই করা।
বলা বাহুল্য, পবিত্র ঈদুল আজহা অর্থাৎ কোরবানির ঈদ বিশে^র মুসলমানদের একটি বৈশি^ক সংস্কৃতি। প্রতিটি মুসলিম সমাজ এর সাথে সম্পৃক্ত। কোরবানির ঈদ সমাজের ধনী-দরিদ্রের মধ্যেকার ব্যবধান অনেকাই ঘুচিয়ে দেয়। কোরবানির পশুর মাংস আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের অসহায়-দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে এক অকৃত্রিম মেলবন্ধন তৈরী হয়। এই উৎসব প্রমাণ করে যে, সম্পদের প্রকৃত মালিকানা নয়, বরং ত্যাগের মানসিকতাই সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে পারে। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এদেশে একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ আবর্তিত হয়। পশুর খামার, লালন পালন, পশুর হাট ও চামড়া শিল্প অর্থনীতিকে সচল রাখে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোরবানির ঈদ একটি বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে আসে। এদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ অপুষ্টির শিকার। তারা প্রাণিজ প্রোটিন খেতে পায় না। অনেকে বছরে মাত্র একটিবার কোরবানির ঈদের সময় মাংস আহার করে। তাই কোরবানির ঈদ এসব হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে অপরিসীম আনন্দ ও প্রশান্তি নিয়ে আসে।
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এদেশের প্রাণিসম্পদ খাত সমৃদ্ধ হয়। সারা বছর একটি বড় সংখ্যক গরু ছাগলের লালন পালন হয় ঈদের সময় বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে। এসব পশুর চামড়া রফতানী হয় বিদেশে। এতেও বেশ বৈদেশিক মুদ্রা আসে দেশে। এভাবে কোরবানির মতো একটি ধর্মীয় উৎসব দেশের সমাজ ও অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
সর্বোপরি, বর্তমান সময়ে মূল্যস্ফীতি ও নানামুখী অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও মানুষ ত্যাগের আনন্দে শামিল হয়। তবে এ সময় সমাজের বিত্তবানদের উচিত সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়ানো। অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মানুষ যেনো ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে সবাইকে। ঈদুল আজহা আমাদের শিক্ষা দেয় হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রাখার। ত্যাগের এই আনন্দ কেবল উৎসবের দিনেই সীমাবদ্ধ না রেখে, তা যেনো সারা বছরের জন্য মানুষের জীবন ও কর্মে প্রতিফলিত হয়, এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।




