দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্বল বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ জুন ২০২৬, ৮:২৩:০৯ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতের আড়ালে থাকা বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ ও আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে| জমতে থাকা এই লোকসানের ধাক্কায় ব্যাংকগুলোর মূলধন বা নিরাপত্তা বাফার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| ফলে আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানেও নেমে গেছে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো|
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট (আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক বা মাইনাস পর্যায়ে নেমে গেছে| মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ব্যাংকের একটি আর্থিক শক্তিমত্তার গুরুত্বপূর্ণ সূচক| এটি দেখায়, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ থেকে ক্ষতি হলে সেই ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত মূলধন ব্যাংকের আছে কি না| অনুপাত ঋণাত্মক হয়ে যাওয়া মানে লোকসান ব্যাংকের নিরাপত্তা বাফার সম্পূর্ণ গ্রাস করেছে|
২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের সিআরএআর ছিল মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ| তুলনায় গত বছরের সেপ্টে¤^র পর্যন্ত ভারতে এই হার ছিল ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের শেষে পাকিস্তানে ২০ দশমিক ৮০ শতাংশ|
আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে হয়| এর সঙ্গে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ সুরক্ষা বাফারও রাখতে হয়| সেই মানদণ্ড থেকে বাংলাদেশ এখন অনেক নিচে অবস্থান করছে|
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে ছিল| তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর দীর্ঘদিনের আড়ালে থাকা ক্ষতি ও খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করে| এরপর থেকেই খাতটির আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে| ২০২৪ সালে ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ| একই সময়ে ভারতে ছিল ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ২০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ|
তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই কম মূলধন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল| সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল প্রায় ১১ শতাংশ| কিন্তু মাত্র এক বছরে তা ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্টেরও বেশি কমে মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে আসে|
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে ৪২টি ব্যাংক ব্যাসেল-৩ এর শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে| এসব ব্যাংকের দখলে রয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের ৬০ শতাংশের বেশি| অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক, বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংক এবং কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্বল মূলধন অবস্থাই সামগ্রিক পতনের প্রধান কারণ| ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় চাপের উৎস হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণ|
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ| চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ|
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ঋণাত্মক মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ব্যাংক খাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন| তিনি বলেন, সর্বশেষ পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে আগের বছরের তুলনায় ব্যাংকিং খাতের ¯^াস্থ্য আরও খারাপ হয়েছে| সমস্যাগুলো দিন দিন আরও জটিল ও গুরুতর হয়ে উঠছে| মুজেরির মতে, এই সংকট একদিনে ˆতরি হয়নি, বহু বছরের জমে থাকা সমস্যার ফল এটি| তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতকে টেকসই ও সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর ও কার্যকর সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই|





