আমেরিকা-ইরান শান্তিচুক্তি : স্বস্তির চেয়ে চ্যালেঞ্জই বেশি
প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ জুন ২০২৬, ১১:৫৯:৪২ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : ইরানের সঙ্গে ভার্চুয়াল মাধ্যমে চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গেছে। আর সরাসরি কাগজে-কলমে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা আগামীকাল শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। সোমবার রাতে এই ঘোষণা করেই জয়ের দামামা বাজিয়ে দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুই দিন আগে বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, তেহরান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি মেনে না চলে তবে তিনি পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত আছেন।
ওদিকে, চুক্তির কাছাকাছি সময়েও ইসরায়েল এখনও রহস্যময়। কিন্তু ট্রাম্প দাবি করে বসে রয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে অবাধে যাতায়াত করতে পারবে সব দেশের জাহাজ। তাঁর দাবি, হরমুজ ইতিমধ্যে আংশিক ভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। জাহাজ চলছে। শুক্রবার সম্পূর্ণ চালু হয়ে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, এবার পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ফিরবে। কিন্তু তিন মাস আগে যে লক্ষ্যে ইরানে হামলা শুরু করেছিল আমেরিকা-ইসরায়েল, তা কি পূরণ হল? ইরান কি বন্ধ করে দেবে তাদের পরমাণু প্রকল্প? ট্রাম্প মুখে যা-ই বলুন, আমেরিকা-ইরানের শান্তিচুক্তি কিন্তু তাঁকে খুব একটা স্বস্তি দিতে পারেনি। উল্টো চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে ইসরায়েল এবং আমেরিকা। তার আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের সামরিক শক্তি নির্মূল করে দেবেন তাঁরা। পরমাণু প্রকল্প বন্ধ করে দেবেন। সে দেশের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলা হবে। সেখাকার মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন, চুক্তি করার জন্য ইরানের সামনে একটাই পথ-‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’।
কেউ কেউ বলেন, ট্রাম্প আসলে সে সময় হরমুজের পানি মাপতে ভুল করেছিলেন। সেখানে গিয়ে যে এমন করে ‘হাবুডুবু’ খেতে হবে, বোঝেননি ট্রাম্প। নিজের জন্মদিনে সামাজিকমাধ্যমে চুক্তির কথা ঘোষণা করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তিনি লেখেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সকলকে অভিনন্দন। হরমুজ প্রণালীর শুল্কমুক্ত ব্যবহারে আমি অনুমোদন দিচ্ছি। পাশাপাশি সেখান থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি। এবার সারা পৃথিবীর জাহাজ তাদের ইঞ্জিন চালু করে দিক। তেল পরিবাহিত হোক।
কিন্তু ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরে ২৪ ঘণ্টাও কাটেনি। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র সোমবার দাবি করেছেন, হরমুজে শুল্ক আদায় করা হবে। ইসমাইল বাঘেই বলেন, আমরা সব সময় বলে এসেছি, যে শুল্ক নেব না। কিন্তু জাহাজ পরিষেবা, পরিবেশ রক্ষা, জাহাজের বিমা এবং অন্য জরুরি পরিষেবার জন্য মূল্য আদায় করা হবে। এ-ও স্পষ্ট করে দেন, আমেরিকার উপরে ‘গভীর অবিশ্বাস’ রয়েছে তাঁদের।
শুধু হরমুজ খোলা নয়, ট্রাম্পের অস্বস্তি বৃদ্ধি করেছে ইরানের পরমাণু প্রকল্প। গত কয়েক মাসে তিনি বার বার বলেছেন, আমেরিকার এটা বরাবরের নীতি, বিশেষত আমার প্রশাসনের যে, ওই সন্ত্রাবাদী শাসকের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না। আমি আবার বলব একই কথা। এমনকি, গত শনিবার, যখন তিনি ঘোষণা করেন যে, পরের দিন, রবিবার, দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হবে, তখনও দাবি করেন, ইরানের শীর্ষনেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের আর পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। তারা কিনবেও না, তৈরিও করবে না। কোনও ভাবেই তা রাখবে না।
কিন্তু ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজমে ঘারিবাবাদির গলায় শোনা গেছে ভিন্ন সুর। কাজমের কথায়, ‘চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা হবে। তবে তার আগে চুক্তির অধীনে আমেরিকা তাদের প্রতিশ্রুতিগুলি পালন করছে কি না, তা যাচাই করা হবে। দেখা হবে, আদৌ তারা শত্রুতা ভুলে হরমুজ প্রণালী থেকে অবরোধ তুলছে কি না, ইরানের আটকে রাখা সম্পদ মুক্ত করছে কি না। ভবিষ্যতের চুক্তি নিয়ে প্রাথমিক স্তরের একটি আলোচনা শুক্রবার জেনেভাতেই সেরে রাখা হবে বলে জানান কাজমে। গত শনিবারই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়ে দিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষ করা নিয়ে এই আলোচনা হবে দু’টি পর্বে। দ্বিতীয় পর্বে হবে পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা, যাতে সময় লাগতে পারে ৬০ দিন। আরাঘচির দাবি, এখন যা পরিস্থিতি, তাতে তেহরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলতে পারে না।
ট্রাম্প যদিও সেই বিষয়টিতে আর আলোকপাত করতে চাননি। তা নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। উল্টো তিনি বলেছেন, এই অসাধারণ চুক্তিটি সমগ্র অঞ্চলে শান্তি এবং সুরক্ষা ফিরিয়ে আনবে। এর আগে অনেক প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করেছিলেন। আমার আগে সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন। পশ্চিম এশিয়ার নেতারা এই প্রথম এক জন প্রেসিডেন্টকে পেলেন, যিনি তাঁদের শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে পৌঁছোতে সাহায্য করতে পারেন। তার পরেই ইরানের পরমাণু প্রকল্প বন্ধ করা নিয়ে কিছু পরস্পর-বিরোধী কথা বলেছেন। আগে বলেছিলেন, প্রকল্প বন্ধ না করলে ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেবেন। পরে সেই তিনিই জানান, তেহরানে ইউরেনিয়ামের ভান্ডার অপসারণ নিয়ে কোনও তাড়াহুড়ো নেই তাঁর।




