আধঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলমগ্ন সিলেট
প্রকাশিত হয়েছে : ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০২:২২ অপরাহ্ন
ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস, বাড়ছে
নদীর পানি, বাড়ছে উদ্বেগ

স্টাফ রিপোর্টার: সবেমাত্র আষাঢ়ের শুরু। অথচ বর্ষার ভরা মৌসুমের শুরুতেই অল্প সময়ের বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে সিলেট মহানগরী। মাত্র ৩০ মিনিটের বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। এদিকে আগামী কয়েকদিন ভারী ও অতিভারী বৃষ্টি ও বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে নদনদীর পানি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আষাঢ়ের শুরুতেই যদি মাত্র আধা ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানিবন্দী হতে হয়, তবে সামনে পুরো বর্ষা মৌসুমে তাদের ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ছড়া খাল উদ্ধার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কোনো সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সূত্রমতে, সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় (১৭ জুন সকাল ৬টা থেকে ১৮ জুন সকাল ৬টা পর্যন্ত) ৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর পরবর্তী ১২ ঘণ্টায়, অর্থাৎ ১৮ জুন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আরও ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ফলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ৩৬ ঘণ্টায় ১২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের জাফলংয়ে ৫৯.০ মি.মি. এবং লালাখালে ৫২.০ মি.মি. বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সাথে ভারতের মেঘালয় রাজ্যেও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর পানি সিলেট স্টেশনে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আবহাওয়া সংস্থাসমূহের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৫ দিন সিলেট বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে আগামী ৩ দিন সুরমা নদীসহ সিলেট বিভাগের সারিগোয়াইন ও যাদুকাটা নদীর পানি সমতল আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র আরও জানায়, এই সময়ে নদীগুলো সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার সকালের বৃষ্টিতে নগরের, দরগাহমহল্লা, দাড়িয়াপাড়া, তালতলা, মির্জাজাঙ্গাল, হাওয়াপাড়া, জিতু মিয়ার পয়েন্ট, ওসমানী মেডিকেল হাসপাতাল, উপশহর, তেররতনসহ বিভিন্ন এলাকা পানিবন্দী হয়ে পড়ে।
নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি নগরীর অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণে এই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, অন্যদিকে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরী প্লাবিত হওয়ার এই চিত্র সিলেটের সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও দীর্ঘ করছে। নগরবাসীর দাবি, লোকদেখানো পরিচ্ছন্নতা অভিযান বন্ধ করে স্থায়ী ও কার্যকর টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
নগরের দাঁড়িয়াপাড়া এলাকার রফিক আহমেদ বলেন, সকালের ৯টার দিকে শুরু হওয়া মাত্র ৩০ মিনিটের বৃষ্টিতে বাসা বাড়িতে পানি উঠে যায়। টানাটানি করে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়েছি। পানি বেশিক্ষণ না থাকলেও এই অল্প সময়ে যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলেই বাসা বাড়িতে পানি উঠে যায়। আমাদের বাসায় ২০০৪ সালের ভয়াবহ বন্যায়ও পানি উঠেনি। অথচ এই কয়েক বছর সামান্য বৃষ্টি দিলেই পানি উঠে যায়।
হাওয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফয়সল চৌধুরী বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তারপরও আমরা সুফল পাচ্ছি না।’
সিলেটে বন্যার তাৎক্ষণিক ঝুঁকি না থাকলেও সিলেটের নদনদীর পানি বাড়ার কথা জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মুহূর্তে সিলেটের কোনো নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। দেশের সব প্রধান নদীই বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আগামী ৩ দিন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে কুশিয়ারা নদীর পানিও আগামী কয়েকদিনে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী ৫ দিন সিলেট বিভাগ ও ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
বিশ্লেষকরা জানান, বন্যা পরিস্থিতি মূলত নির্ভর করে স্থানীয় বৃষ্টিপাত, মেঘালয়ের উজানের বৃষ্টি, সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি এই তিনটি উপাদানই বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী। তাই বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে নদীগুলোর বর্তমান অবস্থায় দেখা যায়, সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১ দশমিক ৫৯ মিটার নিচে, সিলেট পয়েন্টে বিপদসীমার ২ দশমিক ০৪ মিটার নিচে ও সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ১ দশমিক ৩২ মিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি রয়েছে বলে রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নদী এখনও নিরাপদ অবস্থায় আছে, কিন্তু পানি বাড়ছে। যা ভবিষ্যৎ ঝুঁকির একটি ইঙ্গিত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক দিনে ৫০ মিমি বা তার বেশি বৃষ্টিপাত স্থানীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং জলাবদ্ধতার কারণ হতে পারে।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় জাফলংয়ে ৫৯ মিমি, লালাখাল ৫২ মিমি ও সুনামগঞ্জ: ১২৫ মিমি বৃষ্টি রেকর্ডপাত করা হয়েছে। সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন ও যাদুকাটা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে সাময়িক প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, অল্প সময়ের এই বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে আমরা জলাবদ্ধতা বলতে পারছি না। যেহেতু নগরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু কাজ হয়েছে। তা কতটুকু কার্যকর হয়েছে তা দেখতে হলে আমাদের একটা লম্বা সময়ের বৃষ্টিপাতের অপেক্ষা করতে হবে। দুই আড়াই ঘন্টার লাগাতার বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি কি দাঁড়ায় সেটা দেখার পরে এ বিষয়ে বলা যাবে। তিনি আরও বলেন, বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচতে হলে নদীখনন অপরিহার্য। মেঘনা অববাহিকায় কিছু স্থানে খনন হলেও সিলেটে তা হয়নি।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা বৃষ্টির পানি দ্রুত সরাতে পারছে না। খাল দখল, নালা ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা জলাবদ্ধতাকে তীব্র করছে জানতে চাইলে সিসিক প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আজ ( বৃহস্পতিবার) সকালে যেসব এলাকায় পানি জমেছিল সেসব এলাকার ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করেছি। ১০/১৫ মিনিটের মধ্যেই পানি নেমে যায়। তবে এই সময়ের জন্য পানি কেন জমলো এর কারণে খুঁজে বের করার জন্য আমি সিসিকের প্রকৌশল ও বর্জ্য শাখাকে নির্দেশ দিয়েছি।
পানির সবচেয়ে বড় আধার সুরমা নদী খননের বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদি সুফল পেতে আমরা মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের উন্নতি ঘটবে এবং নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসবে।




