সিলেটে মানসিক চিকিৎসার বড় অংশই শিক্ষার্থীরা
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২:৫০:৪০ অপরাহ্ন
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ

মামুন পারভেজ:
সিলেটে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। মানসিক চাপ, অবসাদ ও বিষণ্নতায় ভুগছে অনেকে। সচেতনতা, পারিবারিক সহমর্মিতা ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়লেও সিলেটে এ বিষয়ে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। মানসিক চাপ, অবসাদ, বিষণ্নতা থেকে শুরু করে জটিল মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি বলে জানিয়েছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের মানসিক ও মনোরোগ বিভাগসংশ্লিষ্ট সূত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
আজ ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘জীবনের কথা শুনি, বাস্তব পরিবর্তন আনি’। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে এবারের প্রতিপাদ্যে। দিবসটি উপলক্ষে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ দূর করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা ও পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের মানসিক ও মনোরোগ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা নিয়ে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। মানসিক চাপ, অবসাদ ও বিষণ্নতার পাশাপাশি বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও হ্যালুসিনেশনের মতো সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও চিকিৎসা নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে, এসব সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তবে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে চিকিৎসকরা জানান, অবসাদ বিষন্নতা থেকে মানসিক চাপের প্রভাবে অনেকেই মাদকের ফাঁদে পা দিচ্ছে, কেউ কেউ করছে আত্মহত্যা।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংকোচ: মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হলেও সামাজিক সংকোচ, লোকলজ্জা ও কুসংস্কারের কারণে অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করতে না পারা কিংবা মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতাও সহায়তা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল, অভিভাবকদের প্রত্যাশা, অন্যের সঙ্গে তুলনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপন, পড়াশোনা, ঘুম, সম্পর্ক এবং কর্মক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মানসিক সমস্যাকে অবহেলা না করে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যেও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০৩ জনে। ২০২৫ সালে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল স্কুলপড়ুয়া শিশু। এসব তথ্য শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, “মানসিক চাপ থেকে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার পথে পা বাড়াচ্ছেন। আত্মহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা পরিবর্তনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন।”
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকটের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর সামাজিক প্রত্যাশার চাপ কমানো, অন্যের সঙ্গে তুলনা না করা এবং কাউকে হেয়প্রতিপন্ন না করার মাধ্যমে তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
প্রয়োজন সহমর্মিতা ও কাউন্সেলিং: মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোপী কান্ত রায় বলেন, মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে কৈশোরে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের পাশাপাশি পড়াশোনা, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এ সময়ে অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা জরুরি।
তিনি দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, “১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কোনো সমস্যা বা ব্যর্থতার জন্য অপমান বা অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে মানসিকভাবে পাশে থাকতে হবে। সন্তান যেন যেকোনো সংকটের কথা নির্ভয়ে পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, উচ্চশিক্ষার পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার ও চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত কাউন্সেলিং, ক্যারিয়ার গাইডেন্স এবং সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সেলর নিয়োগ, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়েই প্রয়োজন সহায়তা: বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার সহজলভ্যতা বাড়ানো জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনা, কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের কাছে রোগী পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণ বা অনুভূতিতে পরিবর্তন দেখা দিলে তাকে দোষারোপ না করে মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা উচিত। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের আহ্বান—মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারে খোলামেলা আলোচনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিদ্যমান সংকোচ দূর করার পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।





