দাম বাড়িয়েও কাটছেনা এলপিজি সংকট
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৭:০৮ অপরাহ্ন
পরিবহন খরচ বেশি হওয়ার দাবি পরিবেশকদের

জালালাবাদ রিপোর্ট : দাম বাড়িয়েও স্বস্তি নেই এলপিজি গ্রাহকদের। সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর না হওয়ায় সিলেটে ১২ কেজির একটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। ফলে প্রতিটি সিলিন্ডারে গ্রাহককে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। দাম বাড়ানোর পরও বাজারে সরবরাহসংকট না কাটায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
জানা গেছে, সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবারগুলোকে বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি ভয়াবহ। সিলেট নগরীর কিছু দোকানে ২০০০ টাকায় সিলিন্ডার মিললেও গ্রামে ২৫০০ টাকার নিচে সিলিন্ডার মিলছেনা।
এদিকে রান্নার কাজে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবারের মাসিক ব্যয় এতে বেড়ে যাচ্ছে। একদিকে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে চাহিদামতো সরবরাহ না থাকায় বাজারে স্বাভাবিক পরিস্থিতিও ফিরছে না। ফলে সরকার দাম নির্ধারণ করলেও তার সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ গ্রাহকেরা।
এলপিজি পরিবেশকদের দাবি, কোম্পানি থেকে সিলিন্ডার সংগ্রহ করে সিলেটে আনতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ে। এর সঙ্গে সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো, গুদামভাড়া, কর্মচারীদের মজুরি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যুক্ত হয়। এসব খরচ বিবেচনায় নিয়ে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করলে তাঁদের লোকসান গুনতে হয়। একারণে নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি তাঁদের। তবে পরিবহন ও পরিচালন ব্যয়ের এই যুক্তির মধ্যেও বাড়তি দাম দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
সিলেট নগরীর সুবিদবাজারের খুচরা বিক্রেতা জানান, সরকারী মূল্যে পাইকারী কিনে সেই দামে বিক্রি করলে আমাদের মুনাফা থাকেনা। এর উপর আবার বাসায় ডেলিভারী দিতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা অতিরিক্ত নিতে হচ্ছে।
এক মাসে দাম বাড়ল ২৫২ টাকা:
গত ৪ অক্টোবর অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করে বিইআরসি। এতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে এই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা। তবে নতুন দাম ঘোষণার পরও সিলেটে বাজারমূল্য নির্ধারিত দামের ধারেকাছে আসেনি।
বর্তমানে সিলেটে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের তুলনায় গ্রাহককে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে। দাম সমন্বয়ের উদ্দেশ্য থাকলেও সরবরাহ ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানের কারণে গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমছে না।
কমিশন বাড়ানোর দাবি পরিবেশকদের:
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি পরিবেশক পর্যায়ের কমিশন ও পরিচালন ব্যয় সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির দাবি, ২০২১ সালে পরিবেশকদের জন্য সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছরে পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। বর্তমান কমিশনে এসব খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত সিলিন্ডার পরিবহনে খরচ হয় ৫০ টাকা। ট্রাকে ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে ব্যয় হয় আরও ৩৫ টাকা। এ ছাড়া কর্মচারীদের মজুরি, গুদামভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য খাতে খরচ হয় ২৫ টাকা। সব মিলিয়ে এসব খাতে ব্যয় ১১০ টাকা। এর সঙ্গে সিলিন্ডারপ্রতি ৪০ টাকা মুনাফা যোগ করলে পরিবেশক পর্যায়ে মোট ১৫০ টাকা প্রয়োজন বলে দাবি সংগঠনটির। অথচ কমিশন নির্ধারিত রয়েছে ৫০ টাকা। ফলে তাঁদের হিসাবে সিলিন্ডারপ্রতি ১০০ টাকা ঘাটতি থাকছে।
গত ৬ অক্টোবর এ বিষয়ে বিইআরসিকে চিঠি দেয় এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি। চিঠিতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় ও কমিশন সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজারে মূল্যসংক্রান্ত অস্থিতিশীলতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। সংগঠনটির দাবি, বিভিন্ন কোম্পানির মূল্যতালিকায় পার্থক্য থাকায় বাজারে একই পণ্যের দামে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এতে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা যেমন সমস্যায় পড়ছেন, তেমনি ভোক্তাদেরও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
আমদানি স্বাভাবিক, সরবরাহ নিয়ে সংকট:
এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ টানা দুই মাসে আমদানির পরিমাণ কাছাকাছি ছিল। সংগঠনটির বক্তব্য, আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে পরিবেশকদের অভিযোগ, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকটি কোম্পানি সরবরাহ কমাতে শুরু করে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মেঘনা ফ্রেশ, ওমেরা, আইগ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স ও বিএম নিয়মিত এলপিজি সরবরাহ করছে। তবে এসব কোম্পানির কাছ থেকেও চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য কয়েকটি কোম্পানি মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণে সরবরাহ করছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি দামের তালিকা দিচ্ছে বলে অভিযোগ পরিবেশকদের।
পরিবেশকদের দাবি, সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এর ফলে পরিবহন ও অন্যান্য খরচের চাপের পাশাপাশি পণ্য সংগ্রহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে লোকসানের আশঙ্কা থাকায় তাঁরা বাড়তি দামে বিক্রি করছেন বলে দাবি তাঁদের। কমিশন ও ব্যয় সমন্বয়ের দাবি পূরণ না হলে কোনো কোনো ব্যবসায়ী এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার কথাও ভাবছেন বলে জানা গেছে।
বাড়তি দামের চাপ ভোক্তার ওপর:
এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সংস্থাটির পরিচালক আতিয়া সুলতানার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সিলিন্ডার গ্যাসের বিক্রি তদারকিতে ২৪২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ের ৪৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এরপরও বাজারে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। ২০১৫ সালে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ হওয়ার পর থেকে এলপিজির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা ১৫ লাখ টনের বেশি। এই খাতের প্রায় পুরোটাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল, যারা আমদানি করে বাজারে সরবরাহ করে।
রান্নার পাশাপাশি শিল্প ও পরিবহন খাতেও এলপিজি ব্যবহৃত হয়। তবে সরবরাহসংকটের প্রভাব পরিবহন খাতেও পড়ছে। এলপিজি ফিলিং স্টেশন মালিকদের সংগঠনের মহাসচিব হাসিন পারভেজের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি স্টেশনে মাসে যেখানে ৩০ টন গ্যাসের চাহিদা থাকে, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৬ টন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় স্টেশনগুলো লোকসানের মুখে পড়ছে।
সিলেটেও এলপিজির মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় ভোক্তাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পরিবেশকদের পরিবহন ব্যয় ও কমিশনসংক্রান্ত দাবি, কোম্পানিগুলোর সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীদের ব্যয় সমন্বয়ের দাবি ও ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে গ্যাস পাওয়ার অধিকার—দুই দিক বিবেচনায় কার্যকর উদ্যোগ না এলে সিলিন্ডারের বাড়তি দাম ও সরবরাহসংকটের চাপ সাধারণ মানুষের ওপরই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।





