লাগামহীন এলপিজির বাজার, সমন্বয়ের নামে দাম আরও বাড়ার আশংকা
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২:০৯ অপরাহ্ন
২৯ অক্টোবর গণশুনানি

মামুন পারভেজ: সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা নেই, সিলেটে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার চলছে ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমতো। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুণতে হচ্ছে ক্রেতাদের। সরবরাহ সংকট ও কোম্পানিভেদে দামের পার্থক্যের অজুহাতে পাইকারি বাজারেও মিলছে না নির্ধারিত দামে গ্যাস।
এর মধ্যে আবারও দাম সমন্বয়ের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানি ও বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে দাম সমন্বয় করা হলে এলপিজির দাম আরও বাড়ার আশংকা রয়েছে।
এমনিতেই বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে গিয়ে চাপে রয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে এলপিজির দাম বাড়ানো এমনিতেই ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’। এরপর যদি আরো বাড়ে তখন সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠবে।
সিলেট নগরের কুয়ারপাড়, মদিনামার্কেট, টুকেরবাজার ও উপশহর এলাকার বিভিন্ন দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার পরিবর্তে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ব্র্যান্ড ও বিক্রয়স্থানভেদে দামের পার্থক্য থাকলেও সরকারি দামে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ প্রায় একই।
এলপিজির বাজারে বাড়তি দামের বোঝা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। ক্রেতাদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস না পেয়ে বাধ্য হয়েই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে দাম বাড়ানোর ব্যবসায়ীদের দাবিতে তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
নগরের এক ক্রেতা ইমরান আহমদ বলেন, সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও দোকানে গেলে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। রান্নার জন্য গ্যাস প্রয়োজন হওয়ায় বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
ক্রেতাদের দাবি, দাম সমন্বয়ের আগে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক করা, সরকারি মূল্য কার্যকর করা এবং অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। তাঁদের মতে, পাইকারি ও খুচরা—কোনো পর্যায়েই নির্ধারিত দাম কার্যকর না করে মূল্যবৃদ্ধি হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে।
পাইকারি বাজারেও স্বস্তি নেই। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সরকার নির্ধারিত পাইকারি মূল্য ১ হাজার ৭৯২ টাকা হলেও সিলেটে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। কোম্পানিভেদে ক্রয়মূল্যের পার্থক্য, পরিবহন ব্যয় ও আনুষঙ্গিক খরচের কারণে নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে লোকসান গুণতে হয় বলে দাবি তাঁদের। ফলে পাইকারি পর্যায়ের বাড়তি দামের প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও।
এলপিজি ডিলার ও পাইকারি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কামাল আহমদ বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা থাকলেও কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন অপেক্ষা করেও কখনো মাত্র চার-পাঁচশটি সিলিন্ডার পাওয়া যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কামাল আহমদ বলেন, পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ দিয়ে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুণতে হচ্ছে। সরকারি সংস্থার নজরদারির কারণে ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগও নেই। তবে সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
সিলেট জেলা এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাহবুব বলেন, কোম্পানি থেকে প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাস ১ হাজার ৭৪২ টাকায় কিনতে হচ্ছে। পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৮১০ টাকা। অথচ তাঁদের উল্লেখ করা পাইকারি বিক্রয়মূল্য ১ হাজার ৭৯২ টাকা।
তাঁর ভাষ্য, দেশে এলপিজি আমদানির টার্মিনাল রয়েছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের কাছে। তবে ছয়টি কোম্পানির হাতে গ্যাসের মজুত কেন্দ্রীভূত থাকায় সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, সারাদেশে প্রায় তিন কোটি খালি সিলিন্ডার পড়ে আছে। এসব সিলিন্ডার কাজে লাগিয়ে গ্যাস ভরে বাজারজাত করা গেলে সংকট কমতে পারে।
বর্তমান ব্যয় বিবেচনায় সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগামী ২৯ অক্টোবর বিইআরসির সঙ্গে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের বৈঠক ও গণশুনানিতে এ দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে জানিয়েছেন তাঁরা।
মাহবুবুর রহমান মাহবুব বলেন, বর্তমান দামে গ্যাস বিক্রি করে পরিবহন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই দাম সমন্বয় করা প্রয়োজন। দাবি বিবেচনায় নেওয়া হলে আগামী ১ নভেম্বর থেকে নতুন দাম কার্যকর হতে পারে বলে তাঁরা আশা করছেন। তবে এ বিষয়ে বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩০টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি আমদানি ও বটলিংয়ের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের আমদানি টার্মিনাল রয়েছে। বাকি সাতটি প্রতিষ্ঠান আমদানিকারকদের কাছ থেকে এলপিজি কিনে স্যাটেলাইট ফিলিং পয়েন্টের মাধ্যমে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বাজারজাত করে।
এখন সবার নজর ২৯ অক্টোবরের বিইআরসির গণশুনানি ও বৈঠকের দিকে। সেখানে ব্যবসায়ীদের ব্যয় সমন্বয়ের দাবির পাশাপাশি বাজারের অস্থিরতা ও ভোক্তাদের স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিই দেখার বিষয়। কারণ, বাড়তি দামে বিক্রির মধ্যেই যদি এলপিজির দাম আরও বাড়ে, তাহলে রান্নার খরচ সামলাতে হিমশিম খাওয়া পরিবারগুলোর ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করছি। ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত দামেই গ্যাস বিক্রি করতে হবে। সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় মেটাতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা লোকসানের সম্মুখীন হলে তাঁরা আমাদের কাছে আবেদন করতে পারেন। তাঁদের আবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে।”





