হঠাৎ সামরিক সতর্কতা জারি বাংলাদেশে!
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৪৭:০০ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক : বঙ্গোপসাগরে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সামরিক মহড়ার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। কক্সবাজারের আকাশ প্রতিরক্ষা (Air Defence—AD) ফায়ারিং রেঞ্জে অনুষ্ঠিত এই মহড়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা বা নোটাম (Notice to Airmen—NOTAM) জারি করা হয়। ১৯ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট আকাশসীমায় বেসামরিক বিমান চলাচল এবং সংশ্লিষ্ট সমুদ্র এলাকায় নৌযান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এই মহড়াকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সামরিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূল ও কুতুবদিয়া-সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় বিমান বাহিনীর বিশেষ গোলাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে নির্ধারিত এলাকাকে সাময়িকভাবে ‘নো-ফ্লাই জোন’ (No-Fly Zone) ঘোষণা করা হয়। আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে এই মহড়াকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।
একটি দেশের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে সাধারণত বিভিন্ন পাল্লার সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: বাংলাদেশের বিমান ও সেনাবাহিনীর কাছে চীনের তৈরি এফএম-৯০ (FM-90/FM-90E) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি স্বল্পপাল্লার লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলায় ব্যবহৃত হয়। সম্প্রতি বিমান বাহিনী প্রধানের উপস্থিতিতে এ ব্যবস্থার সফল পরীক্ষামূলক গোলাবর্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
কাঁধে বহনযোগ্য ব্যবস্থা: অতি স্বল্পপাল্লায় নিচু দিয়ে উড়ে আসা লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলায় কিউডব্লিউ-১৮ (QW-18) ও এফএন-১৬ (FN-16) ধরনের কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বা ম্যানপ্যাডস (Man-Portable Air-Defence Systems—MANPADS) ব্যবহৃত হয়।
মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার প্রতিরক্ষা: প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। ভারতের হাতে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ (S-400) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে, মিয়ানমারের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অংশ হিসেবে কেএস-১ (KS-1) ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, কক্সবাজারের এই মহড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে চীনের তৈরি অত্যাধুনিক এইচকিউ-২২ (HQ-22) অথবা এর রপ্তানি সংস্করণ এফকে-৩ (FK-3) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এইচকিউ-২২ ও এফকে-৩ মাঝারি থেকে দীর্ঘপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (Surface-to-Air Missile—SAM)। বিভিন্ন সূত্রে এ ধরনের ব্যবস্থার পাল্লা প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত বলে উল্লেখ করা হয়। এগুলো যুদ্ধবিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মতো আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় ব্যবহারের জন্য তৈরি। তবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও ধ্বংসের সক্ষমতা ব্যবস্থাটির সংস্করণ, রাডার এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।
কক্সবাজারে মহড়ার ভৌগোলিক অবস্থান নিয়েও প্রতিবেদনে সামরিক তাৎপর্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মিয়ানমার সীমান্ত ও বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী এই এলাকার নিরাপত্তা আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
মিয়ানমার সীমান্তে সতর্কবার্তা: গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সময় দেশটির যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মহড়াটি মিয়ানমারকে সরাসরি কোনো হুঁশিয়ারি দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছে—এমন বক্তব্যের পক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রয়োজন।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন: ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি ও সামরিক আধুনিকায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ, জ্বালানি সম্ভাবনা ও নৌপথের নিরাপত্তা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীর পাশাপাশি আকাশ নজরদারি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে, কক্সবাজারের এই মহড়া বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যাচাই ও সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এতে নতুন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে কি না, কিংবা মহড়াটির মাধ্যমে প্রতিবেশী কোনো দেশকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে কি না—তা নিশ্চিত করতে আনুষ্ঠানিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের প্রয়োজন।





