উদ্বেগ কাটছে না পোশাকশিল্পে, গাজীপুরে ফের বিক্ষোভ-সংঘর্ষ
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০২:০০ অপরাহ্ন
# উৎপাদন ব্যাহত, বিদেশি ক্রেতাদের কারখানা পরিদর্শন বাতিল

জালালাবাদ ডেস্ক: কয়েক দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের পর নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানাগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করেছে। শ্রমিকরা কাজে যোগ দেওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও কাটেনি শিল্প মালিকদের উদ্বেগ। এর মধ্যেই বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রোববার গাজীপুরের কোনাবাড়িতে ফের বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। এ সময় কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিদেশি ক্রেতাদের কারখানা পরিদর্শন বাতিল এবং ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন পোশাকশিল্প মালিকরা।
রোববার দুপুরে গাজীপুরের কোনাবাড়ির জরুন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অর্ধশতাধিক শ্রমিক লাঠিসোঁটা নিয়ে কাশিমপুর থেকে কোনাবাড়ির জরুনের দিকে আসেন। এ সময় তারা আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এসব কারখানায় তখন উৎপাদন কার্যক্রম চলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানার ভেতরে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদের ধাওয়া দেন। পরে খবর পেয়ে বিজিবি সদস্যরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করেন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, রোববার সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল। বিকেল ৩টার দিকে একই দাবিতে মণ্ডল গ্রুপের কয়েকজন শ্রমিক জরুন মোড়ের দিকে আসেন। এ সময় তারা ছয় থেকে সাতটি কারখানায় ঢিল ছোড়েন। পরে পুলিশ ও বিজিবি তাদের সরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় সাতটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম চলছে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় টানা তিন দিনের শ্রমিক আন্দোলন ও সংঘাতের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন পোশাকশিল্প মালিকরা। আন্দোলনের কারণে কয়েকটি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত কারখানা পরিদর্শন বাতিল হয়েছে। এতে দেশের পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। কোথাও নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যায়নি। তবে আন্দোলনের কারণে কারখানাভেদে ক্ষতির পরিমাণ ভিন্ন। তাৎক্ষণিকভাবে সব কারখানার ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, তার কারখানায় ইংল্যান্ডের একজন নতুন ক্রেতার আসার কথা থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তিনি হোটেল থেকে কারখানায় আসেননি। পরদিন আরও কয়েকজন বিদেশি ক্রেতার কারখানা পরিদর্শনের কথা ছিল। কিন্তু প্রধান কার্যালয় থেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা পাওয়ায় তারাও আসেননি। কোনো বিশৃঙ্খলা হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কারখানার নয়, দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করে। বিদেশি ক্রেতারা সরাসরি এমন পরিস্থিতি দেখলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে ক্রয়াদেশ কমে যেতে পারে। ভবিষ্যতে ক্রেতারা বাংলাদেশকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। কোনো দেশের ঝুঁকির মাত্রা বেশি হলে সেই দেশ থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দামও কম দেওয়া হয়।
শিল্প মালিকদের মতে, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খরচ এবং শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চাপের মধ্যে নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে। তবে নতুন করে কোনো অসন্তোষ তৈরি না হলে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
যেভাবে শুরু আন্দোলন
নারায়ণগঞ্জে দেশের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক আন্দোলন চললেও শুরুতে পোশাকশ্রমিকরা শান্ত ছিলেন। তবে গত ৩ নভেম্বর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকায় আন্দোলন শুরু হয়। এ সময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষের সময় অবরোধে আটকে পড়া কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পরদিন ৪ নভেম্বর ফতুল্লার শিবু মার্কেট ও কাঠেরপুল এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের আবারও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের ইটপাটকেল নিক্ষেপের জবাবে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। পরে শ্রমিকরা কয়েক দফা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসব ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।
এদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিল বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। সংগঠনটির নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এম এ শাহীন বলেন, মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। এখন বোর্ডের মজুরি নির্ধারণ ও ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ঘোষিত মজুরি শ্রমিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে পরবর্তী সময়ে আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া যেতে পারে। তবে বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের একটি অংশ নিজেদের মতো করে আন্দোলন করছে। এর সঙ্গে তাদের সংগঠনের সম্পৃক্ততা নেই।
অন্যদিকে আন্দোলনের পেছনে স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, পতিত সরকারের দোসররা শ্রমিক সংগঠনের ভেতরে ঢুকে উসকানি দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ক্যামেরা ও ড্রোনের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ শ্রমিকদের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নারায়ণগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৬২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মির্জা মোহাম্মদ আরাফাত বলেন, সেখানে নয় প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অসন্তোষ এড়াতে বিজিবি সতর্ক রয়েছে।





