বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে আমাদের করণীয়
প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ৯:৫৮:৪৯ অপরাহ্ন
মোঃ সাঈদুর রহমান ফারাজী ::
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, নিরাপদ আশ্রয়, উন্নত জীবনের প্রত্যাশা কিংবা নব আবিষ্কারের নেশাসহ বিভিন্ন কারণে সভ্যতার উষালগ্ন থেকে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে বেড়াচ্ছে। বস্তুত, সকল অনুন্নত ও উন্নয়নশীল (বাংলাদেশসহ) দেশের মানুষ উন্নত দেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে যান এবং তাদের উপার্জিত প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ (রেমিট্যান্স) নিজ দেশে প্রেরণ করে। আর এই ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্স এসব দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান দুটি উৎস হলো রপ্তানি আয় এবং প্রবাসী আয়। বর্তমানে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকটে রয়েছে, যা মোকাবেলায় বেশি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশ চাইলেই সহজে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে পারবে না, কিন্তু বিশেষ কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে সহজেই প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স প্রবাহ) বৃদ্ধি করতে পারবে। যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্স, যা প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ থেকে আসে এবং যেহেতু বাংলাদেশ চাইলেই এই প্রবাসী আয় বৃদ্ধি করতে পারে, সেহেতু এই সংকটাপন্ন মুহূর্তে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যদিকে, সরকার চাইলেই প্রয়োজন মতো বাংলাদেশি মুদ্রা ছাপাতে পারে, কিন্তু চাইলেই বৈদেশিক মুদ্রা ছাপানো সম্ভব নয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য প্রবাসী আয় বৃদ্ধিই স্বল্পমেয়াদি উত্তম কৌশল।
বিএমইটি-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৪৮ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৭ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ গেছেন। তবে, এই সংখ্যায় ফিরে আসা ব্যক্তিদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত নয়। ধরা যাক, বর্তমানে ১ কোটি বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে কর্মরত আছেন। যদি প্রত্যেক প্রবাসী প্রতিমাসে ন্যূনতম ৫০০ মার্কিন ডলার ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে প্রেরণ করেন, তাহলে দেশের বার্ষিক মোট প্রবাসী আয় হওয়ার কথা ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ মাত্র ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সম্ভাব্য মোট আয়ের (৬০ বিলিয়ন ডলার) মাত্র ৪০%। এখান থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, বাকি ৬০% রেমিট্যান্স দেশে প্রেরিত হচ্ছে হুন্ডি বা অন্যান্য অবৈধ মাধ্যমে।
প্রবাসী আয় বৃদ্ধির জন্য সরকার রেমিট্যান্সের ওপর ২.৫% ইনসেন্টিভ প্রদান করছে, যা রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে সহায়তা করার কথা, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়নি। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির জন্য স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা
আমরা যদি প্রবাসী রেমিট্যান্স আয় ৪০% থেকে বৃদ্ধি করে ৭০% বা ৮০%-এ উন্নীত করতে চাই, তাহলে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের দেশে ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন রেট নির্ধারণ করতে হবে, যা ঐ দেশে বিদ্যমান হুন্ডি রেটের চেয়ে বেশি হবে। উদাহরণ স্বরূপ, মালয়েশিয়া মার্কেটে টাকা-ডলার রেট নির্ধারণ করতে হবে মালয়েশিয়ার হুন্ডি রেট বিবেচনা করে। একইভাবে, বাংলাদেশ সর্বাধিক রেমিট্যান্স প্রেরণকারী অন্যান্য দেশগুলির (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, ইতালি, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি) হুন্ডি রেট বিবেচনা করে তাদের জন্য টাকা-ডলার রেট নির্ধারণ করতে পারে, যাতে ব্যাংকিং চ্যানেলের রেট হুন্ডির রেটের চেয়ে বেশি হয়। অর্থাৎ, বিভিন্ন মার্কেটের জন্য টাকা-ডলার রেট ভিন্ন হবে।
দেশভিত্তিক এই টাকা-ডলার রেট প্রতিদিন মনিটর করতে হবে এবং প্রয়োজনে বাড়াতে বা কমাতে হবে। হুন্ডি রেট সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস অথবা বাংলাদেশি ব্যাংকের কোনো সাবসিডিয়ারি রেমিট্যান্স হাউজের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন দেশের রেট আলাদা হবে, সেহেতু ব্যাংকগুলোর জন্য দেশভিত্তিক রেমিট্যান্স আহরণের রিপোর্ট প্রণয়ন করা জরুরি।
এছাড়াও, এগ্রিগেটরগুলোর মাধ্যমে পাঠানো রেমিট্যান্স যাতে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো দেশভিত্তিক পৃথকভাবে হিসাব করতে পারে এবং সে অনুযায়ী দেশভিত্তিক রেট নির্ধারণ করতে পারে, তাহলে প্রতিটি ব্যাংক তাদের রেমিট্যান্স ক্রয়ের জন্য ওয়েটেড এভারেজ রেট নির্ধারণ করতে পারবে, যা আমদানি ও রপ্তানির জন্য ডলারের দাম নির্ধারণে সহায়ক হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
হুন্ডি রেটের সাথে পাল্লা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমূল্যে ডলার ক্রয় করা অসম্ভব, কারণ এটি অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। সর্বোচ্চ ৩-৫ বছর পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে ডলার ক্রয় করা যেতে পারে, যাতে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে অভ্যস্ত হয়ে যান।
অন্যদিকে, প্রবাসীদের কল্যাণে দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন কার্যক্রম চালু করতে হবে, যা তাদেরকে ৩-৫ বছর পর রেট কম থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করবে। বিদেশিদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ শ্রমিক তৈরি, কম খরচে তাদেরকে বিদেশে প্রেরণ এবং বিভিন্ন দেশে বৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
আমরা যদি সকল প্রবাসীকে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করতে পারি এবং তারা যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়মিত অর্থ প্রেরণ শুরু করেন, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক চিত্র আমূল পরিবর্তন হবে। প্রথমত, আমদানি ব্যয় মেটাতে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকবে। দ্বিতীয়ত, ট্রেড গ্যাপ না থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমশ বাড়তে থাকবে, ফলে টাকার মূল্যও বাড়বে। এবং তৃতীয়ত, দেশে অবৈধ অর্থ পাচার কমবে, যা দেশের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
লেখক : প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সিবিএল মানি ট্রান্সফার এসডিএন বিএইচডি মালয়েশিয়া।