সিলেটের ঐতিহাসিক গণভোট
প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ জুলাই ২০২৫, ২:৪৯:২৯ অপরাহ্ন
মোঃ মোস্তফা মিয়া

বৃটিশ ভারত রাজত্বের শেষ দিনগুলোতে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের সিলেট অঞ্চলের গণভোটের কাহিনী উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে, যা আজও অনুসন্ধানী পাঠক মহলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সিলেট গণভোট হল ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলায় অনুষ্ঠিত একটি গণভোট। গণভোটের উদ্দেশ্য ছিল “সিলেট আসাম-এর সাথে থাকবে ও স্বাধীনতা পরবর্তী ভারত অধিরাজ্যের সাথে যুক্ত হবে নাকি পূর্ব বঙ্গ-এর সাথে যুক্ত হয়ে নতুন সৃষ্ট পাকিস্তান অধিরাজ্যে যোগদান করবে” তা নির্ধারণ করা।সিলেট গণভোট ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ও ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়। ইতিপূর্বে ৩ জুলাই এ বিষয়ে সরকারি ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। গণভোটে ভোটাররা পাকিস্তানি ইউনিয়নে যোগদানের পক্ষে ছিল; তবে, জেলার করিমগঞ্জ মহকুমা রাজনৈতিক কূটকৌশলের মাধ্যমে ভারতের আসাম রাজ্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার রক্তক্ষরণ সিলেটবাসীর অন্তরে আজও বহে যাচ্ছে।
১৭৬৫ সালে এই অঞ্চলে ব্রিটিশ আগমনের পূর্বে সিলেট সরকার মুঘল সাম্রাজ্যের বাংলা সুবাহের অংশ ছিল। প্রাথমিকভাবে কোম্পানি রাজ্যের আমলেও সিলেট বাংলা প্রেসিডেন্সিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর ১০৯ বছর পর ১৮৭৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আসামের সাথে বাণিজ্যিক উন্নয়নের সুবিধার্থে সিলেটকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনিয়ন্ত্রিত প্রধান কমিশনার প্রদেশের (উত্তর-পূর্ব সীমান্ত) অংশ করা হয়। ১০ আগস্ট জেলার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনসংখ্যা, যা হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত অঞ্চলকে স্থানান্তরিত না করার জন্য ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রুকের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া সত্ত্বেও এই স্থানান্তর কার্যকর করা হয়। নর্থব্রুক যখন সিলেট সফরে আসেন তখন এই বিক্ষোভ কমে যায় যখন বাংলার কলকাতা থেকে শিক্ষা ও ন্যায়বিচার পরিচালিত হতো। সেই সাথে সিলেটের হিন্দু জমিদাররা আসামের চা এস্টেটে কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং তাদের পণ্যের বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।
১৯০৫ সালে বাংলার প্রথম বিভাজনের পর নতুন প্রদেশের সুরমা উপত্যকা ও পার্বত্য জেলা বিভাগের অংশ হিসেবে সিলেটকে সংক্ষেপে পূর্ব বাংলা ও আসামের সাথে পুনরায় যুক্ত করা হয়। যাইহোক, এটি স্বল্পস্থায়ী ছিল যখন সিলেট আবার ১৯১২ সালে বাংলা থেকে পৃথক হয়ে ওঠে, যখন আসামকে প্রধান কমিশনার প্রদেশে পুনর্গঠন করা হয়। ১৯২০-এর দশকে সিলেট পিপলস অ্যাসোসিয়েশন এবং সিলেট-বেঙ্গল রিইউনিয়ন লীগ এর মতো সংগঠনগুলো সিলেটকে বাংলায় পুনর্বহালের দাবিতে জনমত গড়ে তোলেন। এরই প্রেক্ষিতে, মুহাম্মদ বখত মজুমদার এবং সৈয়দ আব্দুল মজিদ সহ পুনর্মিলন লীগের নেতারা পরবর্তীতে সুরমা উপত্যকা মুসলিম সম্মেলনের সময় ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট ও কাছাড় বাংলায় স্থানান্তরের বিরোধিতা করেন; আব্দুল মজিদের আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া এবং মুসলিম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সমর্থন তাদের প্রতি ছিল।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্তকালে বর্তমান সিলেট বিভাগ আসামের অংশ ছিল। দেশ বিভাগের পর সিলেট ভারতে থাকবে নাকি পাকিস্তানে যোগ দেবে এই প্রশ্নে গণভোটের ব্যবস্থা করা হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ভারত স্বাধীনতা আইনের ধারা ৩ মোতাবেক গণভোট সংক্রান্ত কার্যক্রমের বৈধতা দেওয়া হয়।
ভারত বিভাজন সংগঠিত হয়েছিল ধর্মীয় সীমারেখা বরাবর। যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা পাকিস্তান গঠন করে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা ভারত গঠন করে। আসামের মধ্যে সিলেট একটি বাঙালি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা ছিল যা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের মধ্যে ছিল। সিলেটের লোকজন বাংলায় কথা বলত যেখানে এই প্রদেশের বাকি লোকজন আসামি ভাষায় কথা বলত। আসাম সরকার মনে করত সিলেট কে সরিয়ে দিলে এটা আরো বেশি স্বদেশী হবে এবং অসমীয়ারা সংখ্যায় অধিক শক্তিশালী হবে। আসামের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোপিনাথ বরদলই ১৯৪৬ সালে বলেন যে তার ইচ্ছা “সিলেটকে পূর্ব বঙ্গে হস্তান্তর করা”।
নির্বাচন পরিচালনার জন্য এইচ. সি. স্টর্ককে রেফারেন্ডাম কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নির্বাচনের জন্য ২৩৯টি কেন্দ্র ঠিক করা হয়। এতে মোট ৪৭৮ জন প্রিসাইডিং অফিসার ও ১৪৩৪ জন পোলিং অফিসার ছিলেন (তথ্য সূত্র ইন্টারনেট)।
গণভোটে সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়। এটি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই জুলাই ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের ৩ নং অনুচ্ছেদের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছিল। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই আগস্ট প্রকাশিত র্যাডক্লিফ বিশ্বাসঘাতকতা করে সিলেটের কিছু এলাকা–প্রধানত করিমগঞ্জ মহকুমা–ভারতকে প্রদান করেছিল, যদিও করিমগঞ্জে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা ছিল যারা পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল, অপরদিকে মৌলভীবাজার মহকুমা (দক্ষিণ সিলেট) ভারতে যোগদানের পক্ষে মতামত দিয়েছিল কিন্তু সিলেটের অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে মহকুমাটি পুনরায় পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়।
ভারত সিলেটের সম্পূর্ণ তিনটি থানা ও একটি থানার অর্ধেক অংশ বিভিন্ন কূটকৌশলে ভারতের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। সিলেট জেলার অধিকাংশ অংশ পূর্ব পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত করা হয়।
গণভোটের ফলাফলকে অসমীয়ার জনগণ ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছিল। গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ভোটার সংখ্যা ছিলো ৫,৪৬,৮১৫। এর মধ্যে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট ছিলো ২,৩৯,৬১৯। ভারতের পক্ষে ছিলো ১,৮৪,০৪১। ৫৫,৫৭৮ ভোট বেশী ছিলো পাকিস্তানের পক্ষে।
সিলেট অঞ্চল তথা সিলেট বিভাগ ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর মাধ্যমে ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।
সিলেট একটি প্রাচীন জনপদ। সুলতানী আমলে সিলেটের নাম ছিল জালালাবাদ। দশম শতাব্দীতে মহারাজা শ্রীচন্দ্র কর্তৃক উৎকীর্ণ পশ্চিমবাগ তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি সিলেট জয় করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের ধারণা, সিলেট বা শ্রীহট্ট (সমৃদ্ধ হাট) বহু আগে থেকেই একটি বর্ধিষ্ণু বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে বর্তমান ছিল। প্রাচীন শ্রীহট্টে বিপুল হারে বাঙালি অভিবাসন হয়েছিল। ১৪ শতকে ইয়েমেনের সাধক পুরুষ হযরত শাহজালাল (র.) সিলেট জয় করেন এবং ইসলাম প্রচার শুরু করেন। মোগল যুগে পাঠান বীর খাজা ওসমান সিলেটের স্থানীয় সামন্তদের সহায়তায় আক্রমণকারী মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহের সময়ে সিলেটে বিদ্রোহীরা বৃটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ব্যর্থ হয়। নানকার বিদ্রোহ সিলেটের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নানকাররা ছিল জমিদারদের ভূমিদাস। নানাকার বিদ্রোহ সহ আরও কয়েকটি বিদ্রোহ সংঘটিত হলে ১৯৫০ সালে এ প্রথা বিলুপ্ত করা হয়।
সিলেট যখন আসামের অংশ ছিল সেই সময়েই, ১৯২৭ সালে সিলেটের রাজনীতিবিদগণ (এম.এল.এ গণ) প্রাদেশিক পরিষদে বাংলায় কথা বলার অধিকার আদায় করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৭ সালে সিলেটের স্থানীয় পত্রিকা আল ইসলাহতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাষার মর্যাদা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের পতন এবং ২০২৪ এর রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে পতিত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সিলেটবাসী ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।





