ঐতিহ্যের প্রতীক জকিগঞ্জের নবাবী মসজিদ
প্রকাশিত হয়েছে : ১০ নভেম্বর ২০২৫, ৬:০৫:২৬ অপরাহ্ন

জকিগঞ্জ প্রতিনিধি: সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার বারহাল ইউনিয়নের খিলগ্রামে অবস্থিত নবাবী মসজিদ এক ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদটি আজও স্থানীয় মানুষের গর্ব ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।
ঐতিহাসিক এই মসজিদটি নির্মাণের সঠিক সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। খিলগ্রামের প্রবীণদের মতে, বহু বছর আগে এক দানশীল নবাব পরিবারের উদ্যোগে এই মসজিদ নির্মিত হয়। তাঁদের সম্মান ও স্মৃতি ধরে রাখতে এলাকাবাসী মসজিদটির নাম দেয় নবাবী মসজিদ। আবার কেউ কেউ বলেন, মসজিদের দেয়াল, খিলান, দরজা ও গম্বুজে নবাবি আমলের স্থাপত্যরীতির ছোঁয়া দেখা যায়। সুতরাং মসজিদটি নবাবী আমলে নির্মিত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলার ইতিহাসে নবাবি আমল শুরু হয় ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে। তখন মুর্শিদ কুলি খান বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার প্রথম নবাব হিসেবে শাসন শুরু করেন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে নবাবি আমলের অবসান ঘটে। সেই সময় সিলেট অঞ্চলও নবাবি প্রশাসনের আওতায় ছিল। ফলে এখানকার স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে সেই সময়ের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এই সূত্র ধরে অনেকে বলে থাকেন যে, মসজিদটি নবাবী আমলে (১৭১৭-১৭৫৭) তৈরি।
মসজিদটি নিয়ে অনেক মুখরোচক কাহিনী প্রচলিত আছে। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল মতিন বলেন, এই মসজিদটির আবিষ্কারক বারহাল ইউনিয়নের অন্তর্গত নিজগ্রামের আরজদ আলী নামের এক পরহেজগার ব্যক্তি। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন খিলগ্রামের গহীন জঙ্গলে একটি মসজিদ আছে। তিনি ঘটনাটি তাঁর অনুসারীদের জানালে তাঁরা মসজিদটি আবিষ্কার করেন। লোকমুখে শোনা যায়, তখন এই মসজিদের ভিতরে একটি সোনার কলাগাছ ও থোড় পাওয়া যায়। সেটি অনেকদিন মসজিদের এক পাশে সংরক্ষিত ছিল। একপর্যায়ে এই কলাগাছ ও থোড়ের কথা জানতে পারেন জৈন্তার জনৈক রাজা। তিনি লোভে পড়ে এটা জোরপূর্ক নিতে আসেন এবং প্রত্যাবর্তনকালে কলাগাছ ও থোড়সহ সুরমা নদীতে ডুবে মারা যান।
খিলগ্রামের নবাবী মসজিদে সেই যুগের স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন আজও চোখে পড়ে। একসময় দেখা যেত লাল ইটের দেয়াল, অর্ধবৃত্তাকার খিলান ও কারুকার্য খচিত চারটি গম্বুজ। কালের পরিক্রমায় মসজিদটিকে নানাবিধ সংস্কারের মাধ্যমে অনেকটাই বদলে ফেলা হয়েছে। এলাকাবাসী জানান, এই মসজিদ একসময় শুধু নামাজের জায়গা ছিল না বরং ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল।
এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখতে সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, মসজিদের সামনে রয়েছে বিশাল ঈদগাহ ও স্বচ্ছ টলমলে পানি সমৃদ্ধ একটি দৃষ্টিনন্দন পুকুর। মসজিদের চারপাশে সারিবদ্ধ সুপারি গাছ। এছাড়া রয়েছে বেশ কয়েকটি তালগাছ। দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ ও ঐতিহাসিক নবাবী মসজিদটি তাই সহজেই পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মোঃ ফয়জুল হক বলেন, ঐতিহাসিক এই মসজিটির খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পেরে গর্ববোধ করছি। আমার পিতাও এই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণে যথেষ্ট অবদান রেখেছিলেন। আমিও তাঁর দেখানো পথে অগ্রসর হচ্ছি। ইতোমধ্যে অনেকগুলো সংস্কার কাজ শুরু করেছি। আমার এই খেদমত অব্যাহত রাখবো যতদিন বেঁচে থাকি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকার বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যদি এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়, তবে এটি সিলেট অঞ্চলের ধর্মীয় ও পর্যটনের এক সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হবে।





