নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে চালু এনইআইআর
প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৯:১৪:৪৬ অপরাহ্ন

জালালাবাদ ডেস্ক: বাংলাদেশের মোবাইল টেলিকম খাতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হলো ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর)। মোবাইল সেটের কালোবাজার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ হ্যান্ডসেট ব্যবহার বন্ধ, রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং চুরি প্রতিরোধ- এই বহুমুখী লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৫ সালের শেষ দিকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এনইআইআর ব্যবস্থা চলতি বছর জানুয়ারি থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়েছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত এই কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে প্রতিটি মোবাইল ফোনের অনন্য আইএমইআই নম্বর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে যুক্ত করে নিবন্ধন করা হচ্ছে। নিবন্ধিত বা ‘সাদা তালিকাভুক্ত’ ফোন ছাড়া অন্য কোনো সেট মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহারযোগ্য থাকবে না- এমন নীতির মধ্য দিয়েই কার্যক্রম শুরু হয়েছে এনইআইআরের। তবে সম্ভাবনাময় এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের শুরুতেই একাধিক কাঠামোগত ও ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে।
ডেটা ব্যবস্থাপনার জটিলতা : এনইআইআর চালু হওয়ার পর দেখা যায়, পুরনো নেটওয়ার্ক রেকর্ড ও ডেটার কারণে একটি এনআইডির সঙ্গে অস্বাভাবিক সংখ্যক মোবাইল ফোন যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন গ্রাহকের নামে ১০০ থেকে ২০০টি ফোন দেখানো হচ্ছে, যা বাস্তব ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
টেলিকম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহু বছর ধরে ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত আইএমইআই নম্বরগুলো একত্রে ডেটাবেজে চলে আসায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। এই ‘ডেটা ক্লিনআপ’ কার্যকরভাবে না করা গেলে ব্যবহারকারীর ভোগান্তি বাড়তে পারে।
গ্রে মার্কেট ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ : দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মোবাইল ফোন গ্রে মার্কেটের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করেছে, যেখানে সরকার নির্ধারিত শুল্ক ও ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি। এনইআইআর কার্যকর হওয়ায় এসব ফোন নেটওয়ার্কে চলবে না, ফলে ছোট ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। মোবাইল ব্যবসায়ীদের দাবি, পর্যাপ্ত সময় ও নীতিগত ছাড় ছাড়া হঠাৎ এই ব্যবস্থা কার্যকর করায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্তি : বিদেশ থেকে আনা ফোন, উপহার হিসেবে পাওয়া সেট কিংবা পুরনো ব্যবহৃত ফোন নিবন্ধনের পদ্ধতি অনেক গ্রাহকের কাছেই অস্পষ্ট। কোথায়, কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন করতে হবে- এ নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব থাকায় সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে।
গোপনীয়তা নিয়ে শঙ্কা : সরকার ও বিটিআরসি বারবার জানিয়েছে, এনইআইআর কেবল ডিভাইস নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য রাখে; এটি কোনোভাবেই কল, বার্তা বা লোকেশন ট্র্যাক করে না। তবুও নাগরিক সমাজের একটি অংশ আশঙ্কা করছে, ভবিষ্যতে এটি একটি কেন্দ্রীয় নজরদারি কাঠামোতে রূপ নিতে পারে।
চুরি ও অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক : আইএমইআই ব্লকলিস্টিং কার্যকর হলে চুরি হওয়া ফোন দ্রুত অকার্যকর করা সম্ভব হবে। এতে মোবাইল চুরির বাজার নিরুৎসাহিত হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ তদন্তে একটি অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবে।
রাজস্ব বৃদ্ধি ও বৈধ বাজার সুরক্ষা : গ্রে মার্কেট সংকুচিত হলে সরকার মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানি থেকে আরও বেশি শুল্ক ও ভ্যাট পাবে। একই সঙ্গে বৈধ আমদানিকারক ও দেশীয় মোবাইল সংযোজন শিল্প প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
ক্রেতা সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা : এনইআইআর চালু থাকলে ক্রেতারা সহজেই আইএমইআই যাচাই করে ফোন কেনার আগে সেটির বৈধতা নিশ্চিত করতে পারবেন। এতে ভুয়া বা ক্লোন ফোন কেনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা : বিশ্বের সব দেশে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকলেও চিলি, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়ার মতো কিছু দেশে আইএমইআই হোয়াইটলিস্টভিত্তিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে মূলত চুরি বা হারানো ফোনের জন্য ব্লকলিস্ট ব্যবস্থাই প্রচলিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে গ্রে মার্কেট বড় সমস্যা, সেখানে এনইআইআরের মতো কঠোর ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে যদি ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।তথ্য বিদেশে যাচ্ছে, এমন অভিযোগের জবাব : এনইআইআর চালুর পর সামাজিক মাধ্যমে এর ডেটা বিদেশে বিশেষ করে ভারতে হোস্ট করা হচ্ছে বলে গুজব ছড়ায়। এ বিষয়ে বিটিআরসি ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অগ্নি সিস্টেমস লিমিটেড পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এনইআইআরের সব তথ্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই সংরক্ষিত।
তাদের দাবি, একটি তৃতীয় পক্ষের আইপি জিওলোকেশন ডেটাবেজের ত্রুটির কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। বাস্তবে এনইআইআর সম্পূর্ণ দেশীয় অবকাঠামোতেই পরিচালিত হচ্ছে এবং বিদেশে তথ্য যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
করণীয় কী : এনইআইআর সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি উল্লেখ্য করে টেলিকম প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সৈয়দ তাসনীম চৌধুরী বলেন, পুরনো ও অব্যবহৃত আইএমইআই ডেটা পরিষ্কার করা। ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীদের জন্য স্পষ্ট ও সহজ নিবন্ধন নির্দেশিকা। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্রে মার্কেট ফোন বৈধ করার সুযোগ বা ট্রানজিশন পলিসি থাকা। তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তা বিষয়ে আইনি নিশ্চয়তা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
তার মতে, এনইআইআর নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মোবাইল টেলিকম খাতে একটি বড় প্রযুক্তিগত ও নীতিগত পরিবর্তন। কালোবাজার নিয়ন্ত্রণ, ভ্যাট আয় বৃদ্ধি এবং চুরি প্রতিরোধে এটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারকারীর আস্থা নিশ্চিত করা না গেলে এই উদ্যোগ পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।
এনইআইআর কী এবং কীভাবে কাজ করে : প্রতিটি মোবাইল ফোনে থাকা ১৫ সংখ্যার আইএমইআই নম্বর মূলত ওই ডিভাইসের একটি ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট। মোবাইল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হওয়ার সময় ফোনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই আইএমইআই নম্বর পাঠায়। এনইআইআর ব্যবস্থায় অপারেটররা সেই আইএমইআই নম্বর কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে যাচাই করে সেটি বৈধভাবে নিবন্ধিত কি না। যাচাইয়ে ফোনটি সাদা তালিকাভুক্ত হলে নেটওয়ার্কে সংযোগ বজায় থাকে আর অবৈধ বা অনিবন্ধিত হলে সেটি ব্লক হয়ে যায়।
এনইআইআর ব্যবস্থায় শুধু অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্তই নয়, চুরি বা হারানো ফোন ব্লকলিস্ট করা, বিদেশ থেকে আনা ফোন নিবন্ধনের সুযোগ রাখা এবং ডিভাইস ক্লোনিং শনাক্ত করার ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।





