আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ এবার ‘হরমুজে’
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ৮:৫৬:৩৬ অপরাহ্ন
জালালাবাদ রিপোর্ট : হরমুজ প্রণালি কখনো উন্মুক্ত করা হচ্ছে, আবার পরক্ষণেই তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আলোচনা শুরু হয়েও বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। এই চক্র যেন থামছেই না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই অস্থিরতার প্রভাব পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো আর কেউ এতোটা সরাসরি অনুভব করছে না। অথচ চলমান এই যুদ্ধের ওপর এই অঞ্চলের দেশগুলোর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই; পরিস্থিতিরও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের পাল্টাপাল্টি দাবির চাপে পিষ্ট হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো।
অন্তত ২৩০টি পণ্যবাহী ট্যাংকার গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে অলস বসে আছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিমা খরচ, যা কয়েক মাস আগেও ছিল অকল্পনীয়। আর সবশেষ যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালিতে একের পর এক জাহাজ জব্দের ঘটনা।
গত দুই সপ্তাহে ইরান অন্তত একবার হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ঘোষণা করে আবার তা বন্ধ করে দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তেহরান সব শর্ত মেনে নিয়েছে, আবার পরক্ষণেই ইরানকে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। যুদ্ধবিরতি চলাকালীন ওয়াশিংটন ও তেহরান যেসব ঘোষণা দিচ্ছে, অপরপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে তা অস্বীকার করছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই অনিশ্চয়তা এখন অস্তিত্বের সংকটে রূপ নিয়েছে। যখন মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে কোনো সিদ্ধান্ত বদলে যায় এবং উভয় পক্ষ একে অপরের দাবি অস্বীকার করে, তখন কোনো অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পরিকল্পনা করতে পারে না। এমন অবস্থায় অঞ্চলটিকে কেবল পরবর্তী পরিস্থিতির পরিবর্তনের অপেক্ষায় দিন গুনতে হয়।
এই প্যাটার্নটি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমে যায়। কিন্তু শনিবারের মধ্যেই দেশটি আবার অধিকাংশ জাহাজের জন্য পথ বন্ধ করে দেয় এবং কয়েকটি জাহাজে গুলিবর্ষণ করে। এই পরিস্থিতির জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসভঙ্গকে দায়ী করে। ফলে মঙ্গলবার পর্যন্ত এই পথে নৌ-চলাচল স্থবির হয়ে ছিল।
মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাজার নাড়িয়ে দেওয়া একটি ঘোষণা এল, তা উদযাপন করা হলো এবং শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হয়ে গেল।
এদিকে, পরশু হরমুজে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস পরপর তিনটি জাহাজে হামলা চালায়। একদিন পর গতকাল জ্বালানি তেল চোরাচালানের অভিযোগে একটি ইরানমুখী তেলের ট্যাঙ্কার বাজেয়াপ্ত করল আমেরিকা। ট্যাঙ্কারটি গায়ানার পতাকাবাহী। আগের নাম ছিল ফিনিক্স।
ভারত মহাসাগরের যে অঞ্চলে আগের ইরানি জাহাজটি তিফানিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। এবারও সেখনেই ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত তেলের ট্যাঙ্কারটিকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। মার্কিন নৌসেনা একটি একটি ভিডিও প্রকাশ্যে এনেছে, যেখানে দেখা গেছে ইরানি ট্যাঙ্কারটির দখল নেওয়া হচ্ছে। ওই ভিডিওর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ম্যাজেসটিক এক্স’। একটি বিবৃতিতে পেন্টাগন জানিয়েছে, আমরা (ইরানের) অবৈধ নেটওয়ার্কগুলিকে ব্যাহত করতে, তাদের সাহায্য প্রদানকারী জাহাজগুলিকে আটকাতে বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক অভিযান অব্যাহত রাখব।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্রমাগত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন কূটনীতি চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। তবে ইরান আলোচনা থেকে পুরোপুরি সরেও আসেনি।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চলায় তারা এখনো আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন, যা সবাইকে এক প্রকার ধোঁয়াশার মধ্যে রেখেছে।
এই বাকযুদ্ধের মাশুল সবচেয়ে সরাসরি পড়ছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর। গত ৯ এপ্রিল আদনক-এর সিইও সুলতান আল জাবের বলেন যে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও প্রণালিটি এখনো উন্মুক্ত হয়নি; কারণ ইরান জাহাজ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ও নানা শর্ত আরোপ করছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে ২৩০টি তেলবোঝাই ট্যাঙ্কার উপসাগরের ভেতরে অপেক্ষা করছে।
বীমা বাজারের চিত্রটিও একই রকম। লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন সতর্ক করে দিয়েছে যে, মূল উত্তেজনাগুলোর কোনো সমাধান না হওয়ায় এই অঞ্চলটি এখনও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি সুপারট্যাঙ্কার পারাপারের বীমা খরচ ছিল জাহাজের মূল কাঠামোর মূল্যের প্রায় ০.২ শতাংশ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন বা ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যার অর্থ দাঁড়ায় একটি একক যাত্রার জন্য বীমা বিল বাবদ প্রায় ৭৫ লাখ (৭.৫ মিলিয়ন) ডলার গুণতে হচ্ছে। এটিই গত দুই সপ্তাহের পরস্পরবিরোধী সব ঘোষণার তিক্ত ফলাফল।




