সড়কের আতঙ্ক ‘লক্কড়ঝক্কড়’ বাস
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ মে ২০২৬, ১২:২০:৫২ অপরাহ্ন

জালালাবাদ রিপোর্ট : সিলেটসহ সারাদেশে লক্ষাধিকেরও বেশি ভাঙাচোরা লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি নিয়ে পরিবহন সেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষকে অমানবিক কষ্ট-নির্যাতন সহ্য করে পথ চলতে হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় দূষণের শিকার হচ্ছে পরিবেশ। ২০ বছরের বেশি পুরোনো এবং ক্রটিপূর্ণ বা ফিটনেসবিহীন ‘লক্কড়ঝক্কড়’ বাস সড়কে কমানো যাচ্ছে না। যা চরম জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে। আইন অনুযায়ী বাস-মিনিবাসের ২০ বছরের ‘ইকোনমিক লাইফ’ পার হলেও তা চলছে।
বিআরটিএ’র নিয়ম অনুযায়ী, বাস ও মিনিবাসের আয়ষ্কাল ২০ বছর এবং ট্রাক ও কার্ভাড ভ্যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর। বাংলাদেশ বিআরটিএর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৩৯ হাজার ১৬৯টি বাস ও মিনিবাস এবং ৪১ হাজার ১৪০টি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ট্যাংকার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে তৎকালীন সরকার বাস ও মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর এবং ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ২৫ বছর নির্ধারণ করে এবং একটি খসড়া স্ক্র্যাপিং নির্দেশিকা প্রস্তুত করেছিল। তবে সে সময় পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের চাপে সেই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। ফলে থেকে যায় সড়কে পুরোনো যানবাহনের দখলেই।
তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস আহাম্মেদ খোকন জানিয়েছেন, ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। অতীতে কারা কি করেছে, সে দিকে আমরা যাব না। আমাদের স্পট বক্তব্য হলো, আমরা লক্কড়ঝক্কড় বাসের বিষয় জিরো টলারেন্স। এ ব্যাপারে বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্ঘলা বাহিনী অভিযানকে আমরা সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করব।
এদিকে লক্কড়ঝক্কড় বাসের বিরুদ্ধে ঢাকায় বিশেষ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, পুলিশ সপ্তাহের (১০-১৩ মে) পরই আমরা রাজধানীতে লক্কড়ঝক্কড় যানবাহনের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করব।
যাত্রী সাধারণের দাবী সিলেটেও লক্কড়ঝক্কড় বাসের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা উচিত।
এদিকে গত বুধবার ডিএমপির এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাজধানীতে চলাচলরত কিছু লক্কড়ঝক্কড় বাস ও পণ্যবাহী যানবাহন প্রায়ই সড়ক, ফ্লাইওভার ও সেতুর ওপর বিকল হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি করছে। এতে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছানোর পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে এসব ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জনদুর্ভোগ কমানো এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ নির্দেশনা অমান্য করলে জরিমানা, যানবাহন ডাম্পিংয়ে পাঠানোসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে ডিএমপি। এ লক্ষ্যে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে অভিযান জোরদার করা হবে। ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার এ বিষয়ে যানবাহন মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, লক্কড়ঝক্কড় মেয়াদোত্তীর্ণ বাসের কারণে ঝুঁকি বাড়ছে। যে বাসগুলো মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে, রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে, আমরা দেখছি যানবাহনগুলো একবারে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে নতুন বাসের কোনো বিনয়োগ নেই। কারণ সড়কে চাঁদাবাজি, নিবন্ধন, রোড পারমিটসহ নানা জটিলতায় পরিবহন সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা আসছেন না। পরিবহন সিন্ডিকেটের কারণে সব কিছু আবর্তীত হচ্ছে। ফলে নতুন বাস নামছে না সড়কে। ফলে লক্কড়ঝক্কড় বাসের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, পরিবহন সেক্টরে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে ‘লক্কড়ঝক্কড়’ বাসের জঞ্জাল থেকে মুক্তি মিলবে না।
লক্কড়ঝক্কড় মোটরযান সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল করায় নানাবিধ ঝুঁকিতে পড়ছেন যাত্রী এবং পথচারী। যখন তখন স্টার্ট বন্ধ হয়ে কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় বাড়ছে হতাহতের ঘটনা। রাজধানীসহ সারাদেশে কিছু বাস এতটাই আনফিট যে যাত্রী বহনে একেবারেই অনুপযোগী। গণপরিবহনের স্বল্পতার কারণে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে এসব বাসে ঝুঁকি নিয়েই যাতায়াত করছেন। এসব বাসের অধিকাংশই রং চটা, জানালার কাচ ভাঙা, সিট ভাঙাচোরা এবং নোংরা।
জানা গেছে, সিলেটের আঞ্চলিক মহাসড়ক গুলোতে বিরতিহীন ও গেইটলক নাম দিয়ে চালানো হচ্ছে লক্করঝক্কড় বাস। বিশেষ করে সিলেট-সুনামগঞ্জ রুটে বিরতিহীন বা গেইটলক গাড়ী মানেই লক্করঝক্কড় বাস। এনিয়ে যাত্রীরা প্রতিবাদ করলেও কোন কাজ হয়নি। উল্টো পরিবহন শ্রমিকদের হাতে নিগ্রহের শিকার হন তারা। এমন চিত্র সিলেট টু জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ, জগন্নাথপুর ও ছাতকসহ আন্তঃজেলা সকল রুটে। লক্করঝক্কড় বাস ও অনভিজ্ঞ চালকের কারণে সিলেট অঞ্চলে বেড়েছে দুর্ঘটনা। এতে বাড়ছে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা।
এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ-এসএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি ট্রাফিক) সুদীপ্ত রায় জানান, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে। তবে এসব যানবাহন রাস্তা থেকে তুলে দেয়ার কোন কেন্দ্রীয় নির্দেশনা এখনো আসেনি। আমরা জেনেছি ঢাকা মহানগরে একটা বিশেষ অভিযান চালু হতে যাচ্ছে। সেই নির্দেশনা পেলে আমরাও অভিযান পরিচালনা করবো।





