মালয়েশিয়ায় বৃষ্টিভেজা রাতে সম্প্রীতির মিলনমেলা
প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ মে ২০২৬, ৭:১১:০৯ অপরাহ্ন

আহমাদুল কবির, কুয়ালালামপুর থেকে: মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের প্রাণকেন্দ্র বুকিত বিনতাংয়ে ভারী বৃষ্টিপাত উপেক্ষা করে অনুষ্ঠিত হলো ‘কুরআনিক মাদানি: নাইট রিসেট-বারসাতু দালাম সাফ’ অনুষ্ঠান। শুক্রবার ৮ এপ্রিল, বৃষ্টিভেজা রাতেও হাজারো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি পুরো এলাকাকে পরিণত করে এক ব্যতিক্রমধর্মী ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক মিলনমেলায়।
মাত্র কয়েকদিন আগেই একই স্থানে ৩০ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘ওয়াটার মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’, যেখানে ছিল নাচ-গান ও বিনোদনের আয়োজন। আর এবার সেই বুকিত বিনতাংই পরিণত হলো জিকির, সালাওয়াত, মুনাজাত ও ভালোবাসার বার্তায় মুখর এক আধ্যাত্মিক পরিবেশে। আয়োজকরা বলছেন, এই পরিবর্তনই প্রমাণ করে মালয়েশিয়া বহুমাত্রিক সংস্কৃতির দেশ হলেও ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধকে সমান গুরুত্ব দেয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী ড. জুলকিফলি হাসান। তিনি বলেন, ‘কুরআনিক মাদানি’ কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং এটি মানুষের মাঝে ভালোবাসা, শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার একটি সামাজিক উদ্যোগ।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি সার্বজনীন বার্তা পৌঁছে দিতে চাই, যা ভালোবাসা, মানবতা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। মালয়েশিয়ার জনগণ বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির হলেও পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দ্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
মন্ত্রী আরও জানান, জনগণের ব্যাপক সাড়া ও অংশগ্রহণের কারণে ভবিষ্যতে ‘কুরআনিক মাদানি’ কর্মসূচি দেশজুড়ে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে। তার মতে, এ ধরনের আয়োজন সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্য জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে আমরা ভালোবাসা ও মানবিকতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাই। সালাম বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও পারিবারিক বন্ধন আমাদের সমাজকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।’
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘সালাম ছড়িয়ে দিন’ প্রচারণা। এর মাধ্যমে সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, সৌহার্দ্য বৃদ্ধি এবং মানুষের মধ্যে সম্মানবোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। ভারী বর্ষণের মধ্যেও বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণিপেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে তরুণদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। আয়োজকদের মতে, তরুণ প্রজন্মকে আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং তাদের মধ্যে ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাই এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
অনেক অংশগ্রহণকারী জানান, নগরজীবনের ব্যস্ততা ও মানসিক চাপের মধ্যে এ ধরনের আয়োজন মানুষকে মানসিক প্রশান্তি দেয়। পাশাপাশি সামাজিক বন্ধনও দৃঢ় হয়। বুকিত বিনতাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক পর্যটন এলাকায় এ আয়োজনের ফলে বিদেশি পর্যটকদের কাছেও ইসলামের শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তি তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া বর্তমানে ‘মাদানি’ ধারণাকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন দর্শনের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। সেই ধারাবাহিকতায় ‘কুরআনিক মাদানি’ কর্মসূচি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় ঐক্য জোরদারের একটি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
তারা মনে করেন, বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক বিভাজনের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে মালয়েশিয়ার এ ধরনের আয়োজন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কারণ এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেবল ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, পবিত্র কুরআনের শিক্ষা মানুষকে শুধু ধর্মীয় অনুশাসনই দেয় না, বরং ন্যায়বিচার, দয়া, সহমর্মিতা ও মানবিকতার দিকনির্দেশনাও প্রদান করে। তাই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কুরআনের মূল্যবোধকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
“কুরআনিক মাদানি” কর্মসূচি মূলত জনগণকে কুরআনের শিক্ষার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ করা এবং দৈনন্দিন জীবনে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ চর্চায় উৎসাহিত করার উদ্যোগ হিসেবে চালু করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি মালয়েশিয়ায় উন্মুক্ত, ইতিবাচক ও আধুনিক দাওয়াহ কার্যক্রমের একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
আয়োজকদের আশা, ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ শহরে আরও বড় পরিসরে এই কর্মসূচি আয়োজন করা হবে। এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও সুদৃঢ় হবে এবং মালয়েশিয়া একটি সহনশীল ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে আরও উজ্জ্বল ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।





